August 8, 2020

আমার বাবার বন্ধু হবার সুবাদে শৈশব থেকেই কাকুকে দেখছি। হঠাৎ হঠাৎ ঝোলা কাঁধে হাজির। আর ঠোঁটে সেই অনাবিল প্রশান্তির ভুবনভলানো হাসি। দরজা থেকেই মার নামে হাঁক ছাড়তেনঃ

তৃপ্তি আমরা এসেছি।

ব্যস, শুরু হয়ে যেত আমাদের বাসায় অনন্ত আনন্দের উৎসব আর আড্ডা। গানের পর গান, কত আলোচনা। কখনো অনেক গভীর বিষয় নিয়ে, কিন্তু অদ্ভুত আনন্দের। ছোট হলেও সেই আসর ছেড়ে এক মুহূর্তও কোথাও যেতে ইচ্ছে হতো না। কাকু একা আসতেন না, গ্রহের পাশে যেমন উপগ্রহ থাকে তেমন তাঁর চারপাশ আলো করে উপগ্রহ হয়ে থাকতেন অনেকে। আমাদের সেই ভাঙ্গা ঘরে চাঁদের হাট বসে যেত। আসতেন অনেকে। যেমন, বিপ্লব কাকু (কণ্ঠশীলনের বিপ্লব বালা), মীজানুর রাহমান, শিশির ভট্টাচার্য, তারিক আলী (মুক্তির গানের), খালেদ খান আরও আসতেন কাকুর গানের শিষ্য যেমন নীলোৎপল সাধ্য, আরও অনেকেই। সবার নাম ভুলেও গেছি।

একটু বড় হলে কাকু তাঁর আনন্দ ভ্রমনে আমাকেও সঙ্গে নিতেন। আমিও উপগ্রহ হবার মহা আনন্দে জুটে যেতাম ড্যাং ড্যাং করতে করতে। কাকুর কাছাকাছি থাকতে পারা আনন্দের, শুধু আনন্দ বললে ভুল হবে “অফুরন্ত আনন্দ” বললে বোধ হয় যথার্থ হয়, ঠিক তাঁর অফুরন্ত প্রাণশক্তির মতো। সারা দেশ ঘুরে বেড়াতেন ক্লান্তিহীন। ভাবা যায়, একবার তো ব্যাডমিন্টন খেলে কাকু আমাকে হারিয়ে দিলেন, তখন উনার বয়স ৬০ তো হবেই। কাকুর উপগ্রহ হবার সাধ ছিল সাধ্য ছিল কিনা জানিনা।

একবার ড্যাং ড্যাং করতে করতে কাকুর সঙ্গেই প্রথম এবং শেষ কান্তজীর মন্দির দেখতে যাওয়া । যাওয়ার পথেই কাকুর কাছে শুনেছি টেরাকোটার কী কী বিশেষ বৈশিষ্টের কারণে কান্তজীর মন্দির আমাদের নিরন্তর আগ্রহের উৎস। টেরাকোটা যেহেতু মাটি দিয়ে তৈরি আর পুড়িয়ে শক্ত করা, তাই এর মধ্যে ভাস্কর্যের সুক্ষতা আনা খুব দুরূহ, এই দুরূহ কাজটিই কান্তজীর মন্দিরের টেরাকোটা গুলোতে মুনশিয়ানার সাথে করা হয়েছে। কতো বিচিত্র বিষয় নিয়ে যে তাঁর আগ্রহ ছিল ভাবলে অবাক হতে হয়। শিল্পকলা থেকে বিজ্ঞান, ধর্ম, খেলাধুলা সবখানেই তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। এভাবেই কাকুর স্নেহ-প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠতে থাকলাম।

একটা মজার ঘটনার কথা মনে আছে। সে সময় কান্তজীর মন্দিরে যাওয়ার আগে একটা ছোট নদী নৌকায় পার হতে হতো। সেদিন ছিল হাটবার, নৌকা ডুবুডুবু না হওয়া পর্যন্ত মানুষ ঠাসা হোল। ওয়াহেদ কাকু বসলেন গলুইয়ের দিকে। নৌকা চলতে শুরু করলো। কিন্তু চলতে শুরু করলে কী হবে? একবার ডানে কাত হয় তো ছলাৎ করে একটু পানি ওঠে নৌকায়, আবার বামে কাত হয় তো আবার ছলাৎ। নৌকা বোধ হয় ডুবতে আর বাকি নাই। ওয়াহেদ কাকুর মুখে সেই প্রশান্তির হাসি। নৌকা বাম দিকে হেললে উনি আঙ্গুল দিয়ে নৌকার ডান দিকে, আর ডান দিকে হেললে বাম দিকে এভাবে দুই আঙ্গুলে একবার নৌকার বামে আর একবার ডানে ঠেসে ধরছেন। নৌকার দুলুনি একসময় কমলো, আমরাও নিরাপদে তীরে পৌঁছালাম। আমি কাকুকে জিজ্ঞেস করলাম আপনি দুই আঙ্গুলে এত বড় নৌকার ব্যাল্যান্স করার চেষ্টা করছিলেন কেন যখন আপনি সেই নৌকাতেই বসে? এতে কী কিছু কাজ হয়? কাকু বললেন, হয়, খুব সামান্য ভারসাম্যের তফাতে আমাদের দেশে তৈরি নৌকা দোলে।

কাকুর কাছে থেকে দুটো চিঠি পেয়েছিলাম। মুক্তার মতো ঝরঝরে অক্ষরে। প্রথম চিঠিটা ছিল একটু শাসনের। একসময় গোগ্রাসে গিলতাম মাসুদ রানা সিরিজের বইগুলো। কাকু দেখে খুব মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিলেন। ফিরে গিয়ে চিঠি লিখলেন, “তোদের এই কাজী আনোয়ার হোসেনকে আমি খুব ভালো করে চিনি, দারুণ মেধাবী এই ছেলেটি আমার নিকট আত্মীয় ও হয়েছিল। প্রথম দিকে এটা ছিল হাসাহাসির বিষয়, আমরা লেখাগুলো দেখে দিতাম। কিন্তু একসময় তা ছেলে ভুলিয়ে রোজগারের উপায় এবং শেষ পর্যন্ত চুরিতে পর্যবসিত হোল। সানজিদা খাতুনের ভাই তার হওয়া হোল না। কাজী মোতাহার হোসেনের ছেলেও তাঁর হয়ে ওঠা হোল না”।

রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের বাৎসরিক সম্মেলন ছিল ওয়াহেদ কাকুর আরেকটা কর্মযজ্ঞ। সারা দেশে ঘুরে ঘুরে কতো রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীকে যে আবিষ্কার করেছেন! প্রত্যেক বছর জেলা শহরগুলোতে দুই বিভাগে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রতিযোগিতা হতো, আর যথারীতি বগুড়ার পালা আসলে আমাদের বাসায় সম্মিলন-পূর্ব আর পরবর্তী আসর বসতো। এই সম্মিলন পরিষদের আয়োজনই সারা দেশে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিলো, রবীন্দ্র সঙ্গীত নিয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে তৈরি হোল এক নতুন আবেগ। বি টি ভি তখন দেশের একমাত্র ভিজুয়াল মিডিয়া। বি টি ভি’র একটা বাৎসরিক দর্শক জরিপ হতো। সেই জরিপে রবীন্দ্রসঙ্গীত বিষয়ক অনুষ্ঠান সেরা অনুষ্ঠানের মর্যাদা পেল। কাকু খুব আনন্দ পেয়েছিলেন এই ফলাফলে।

আমাদের সবার আগ্রহ থাকতো কেন্দ্রীয় সম্মেলন নিয়ে। সেবার সম্ভবত প্রথম রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বিশ্বভারতীর পাঠ শেষ করে দেশে ফিরে এসে সম্মিলন পরিষদের মঞ্চে গান করলেন। উচ্ছ্বসিত ওয়াহেদ কাকু আমার কাছে তাঁর দ্বিতীয় এবং শেষ চিঠিতে লিখলেনঃ “বন্যা একেবারে ভাসিয়ে দিয়েছে, তারপরেও যেটুকু শুকনো ডাঙ্গা ছিল ইফফাত তাও ডুবিয়ে দিলো”।

রাজশাহীতে পড়তে গেলাম; ওয়াহেদ কাকু যখন রাজশাহীতে আসতেন খবর পাঠাতেন আমার কাছে। খবর পেতাম লিসার (রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী লাইসা আহমেদ) বড় ভাই টিয়াজের কাছে (ইমতিয়াজ, আমাদের মেডিক্যালের ছাত্র ছিল। এখন যুক্তরাজ্য বাসী। কিছুদিন আগে টিয়াজের একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম বেরিয়েছে।) লিসাদের বাসাতেই আসর বসতো, আর আমিও রবীন্দ্রসঙ্গীত কিছু বুঝি না বুঝি কাকুর সঙ্গ পাওয়ার জন্য ড্যাং ড্যাং করে গিয়ে হাজির হতাম।
একবার লিসাদের বাসায় আসর চলছে। মাঝে মাঝে কাকুর আলোচনা। এর মধ্যে কলকাতা থেকে দু’জন ভদ্রলোক এসে বসলেন। ওঁরা কাকুকে চিনতেন না। বাংলাদেশের সংস্কৃতি চর্চার খবরও বোধহয় রাখতেন না। যখন আসর ভাঙতে যাবে আমরা সবাই খেতে যাবো— তখন কলকাতার এক ভদ্রলোক আবেগের আতিশয্যে কাকুকে উদ্দেশ করে বলে উঠলেন, “ আপনি শান্তিদেব ঘোষের কথা বলার ধরনটা এত সুন্দরভাবে “নকল” করেছেন!”
কাকু নিজেও বিব্রত, আমরা ক্ষুব্ধ, লিসা গজ গজ করতে থাকলো সারাক্ষণ, “এটা কেমন কথা…” ইত্যাদি।

আমি যখন ঘোরতর ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পরলাম, একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,” রাজনীতি তো চলছে কিন্তু তোর পড়াশোনা কেমন চলছে?“ আমার মাথায় তো তখন রাজনীতি ছাড়া আর কিছু নেই। ধরে নিলাম কাকু আমার রাজনৈতিক পড়াশোনার খবর নিচ্ছেন। আমি মোটামুটি তখন পর্যন্ত আমার পড়া রাজনৈতিক বইয়ের তালিকা কাকুকে পাঠিয়ে দিলাম। কাকু নিশ্চয় খুব হেসেছিলেন। এর উত্তর আমাকে না দিয়ে চিঠিতে বাবাকে লিখেছিলেন, “ পিঙ্কু, তাঁর ইদানীংকালের পাঠ্য বইয়ের একটি তালিকা আমার কাছে পাঠিয়েছে।“

কাকু আমাকে রাজনীতির বিষয়ে কখনো নিরুৎসাহিত করতেন না। তেমন কোন আলোচনাও আমার ছাত্রজীবনে তিনি আমার সাথে করেন নি। একবার শুধু বলেছিলেন, শ্রেণী চেতনা জাতি চেতনার পরবর্তী উচ্চতর স্তর। জাতিচেতনা পরিপূর্ণতা না পেলে শ্রেণীচেতনার উদ্ভব খুব কঠিন।

যে সময় ইন্টারনেটের ব্যবহার শুরু হোল, তখন একবার কাকুকে তা দেখিয়েছিলাম। বিবর্তনের প্রাথমিক ধারণার উপর ১৫ মিনিটের দারুন একটা ফ্লাস প্রেজেন্টেসন দেখিয়ে সেটার মতো করে একটা আইডিয়াও দিয়েছিলাম। ওয়েব-নির্ভর রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখানোর একটা প্ল্যাটফর্ম করার। আইডিয়াটা কাকুর খুব মনে ধরেছিল। কিন্তু সেটা নিয়ে কাজ আর এগোয় নি।

কর্মক্ষেত্রে একসময় ভিটামিন নিয়ে কিছু কাজ করেছিলাম। সেটা জানা মাত্রই কাকু আমাকে শুনিয়েছিলেন পর পর দুবার নোবেল বিজয়ী ভিটামিনের সর্বকালের সেরা প্রবক্তা লিনাস পওলিং এর কথা। অনেকের কাছেই তুচ্ছ ভিটামিনের যে মন বর্ণময় ইতিহাস আর সম্ভবনা থাকতে পারে সেটা আমার মাথাতেই ছিল না। কাকুর আগ্রহে ভিটামিনের সেই না জানা বর্ণময় ঘটনাগুলো নিয়ে বেক্সিমকো থেকে একটা নিয়মিত প্রকাশনা করতাম “হেলথ এন্ড হোপ” নামে। (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পান্থপথে “হেলথ এন্ড হোপ” নামে একটা হাসপাতাল আছে আমার বন্ধুদের। সেই নামটা আমার সেই প্রকাশনার নাম থেকে ধার করে আমারই দেয়া।)

২০০১ সালে একটা আন্তর্জাতিক ক্যান্সার কনফারেন্স করেছিলাম, আমি সেই কনফারেন্সের সদস্য সচিব ছিলাম, কাকে দিয়ে উদ্বোধন করানো যায় তা ভাবছিলাম। কাকুকে দিয়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমানকে (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা) ফোনে অনুরোধ করা হোল, কিন্তু উনি রাজি হলেন না। পরে কাকু নিজেই বুদ্ধি দিলেন উদ্বোধনটা এমন কাউকে দিয়ে করানো উচিৎ যে তোদের অর্জনকে রিপ্রেজেন্ট করেন। যেমন ধর, ক্যান্সার সেরে গেছে এমন কোন সারভাইভর। আমারা সেটাই করেছিলাম। মাইক্রো ইলেক্ট্রনিক্সের কর্ণধার মিঃ দৌলা যিনি একজন ক্যান্সার সারভাইভর ছিলেন, তাঁকে দিয়ে কনফারেন্সের উদ্বোধন করানোটা বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছিলো এবং কনফারেন্স একটা আলাদা মাত্রা পেয়েছিলো।

একদিন হঠাৎ কাকু ফোন করে বললেন,” এই ওষুধটা কী তোর কোম্পানীর?”
বললামঃ হ্যাঁ তাই।
উনি বললেন, এটা কবি শামসুর রাহমানকে দেয়া হয়েছে। জানতে চাইলেন আমি কিছু ওষুধ ওঁকে পৌঁছে দিতে পারবো কি না?
বললাম, নিশ্চয় পারবো। কিন্তু আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে।
আমরা একসাথে কবির শ্যামলীর বাসায় গেলাম। শুভ্রকেশ কবির সাথে এক মনোরম সান্ধ্য আড্ডা হোল। কবিকে কেউ একজন একটা রেড ওয়াইন উপহার দিয়েছিল। কবি সেটা দিয়ে আপ্যায়িত করলেন। কবিকণ্ঠে “চিয়ার্স” এর সেই অপূর্ব বাংলা এখনো আমার কানে ভাসে। কবি গ্লাস তুলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আনন্দ হোক”।

উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা এবং তার পর পরই রমনার বটমূলে একই ঘটনা— এই রকম অস্থির ভীতিকর সময়ে পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের কেন্দ্রীয় সম্মেলন হবে। আমি কাকুর সাথে দেখা হলেই বলছি নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে। কারণ এটাও জেহাদিদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। কাকু তো নির্ভার। আমার কথা পাত্তাই দিচ্ছেন না। শেষ পর্যন্ত আমার চাপাচাপিতে বললেন,”কী করতে চাস? তুই দায়িত্ব নিবি?’
নিলাম দায়িত্ব। সেবার অনেকগুলো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাতে (সে সময় খুব একটা সহজলভ্য ছিল না) পুরো অনুষ্ঠান এবং দর্শকদের গতিবিধি রেকর্ড করা হোল। উপরি হিসেবে পাওনা হোল বাইরে বিশাল পর্দায় অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার। সেটাই ছিল সম্মিলন পরিষদের প্রথম এ ধরনের আয়োজন। সে সময় অডিও ভিসুয়াল কর্মী মেরাজ স্বল্প খরচে এই আয়োজনটা করে দিয়েছিল। নিরাপত্তার ব্যাপারটা কতটুকু মনে ধরেছিল জানি না। তবে কাকু সরাসরি সম্প্রচারের ব্যাপারটা খুব পছন্দ এবং উপভোগ করেছিলেন।

কাছাকাছি সময়ে বগুড়াতে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিশাল আয়োজন হোল। আমরাও উৎসব করে বগুড়াতে গেলাম। মঞ্চ তৈরি হোল বগুড়া জেলা স্কুলের মাঠে। কাকু সেদিনের দৈনিক পত্রিকাতে (সম্ভবত জনকণ্ঠ) একটা উপ সম্পাদকীয় লিখলেন “বগুড়া নয়, এ মহাস্থান”। অনুষ্ঠানে গানের পাশাপাশি আবৃত্তি, রবীন্দ্র রচনা পাঠ এসবও ছিল। কিন্তু দর্শকরা শুধু গান শুনতে চাইছিল। রবীন্দ্র রচনা পাঠ চলার সময় অস্থির দর্শকরা বার বার হাততালি দিয়ে পাঠ বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করছিল। এর পর রচনা পাঠ শেষ হলে কাকু মাইকে এলেন। স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে খুব ধীরে শুরু করলেন। “আপনারা তালি দিতে পারেন। হাতে যত জোড় আছে তা দিয়ে তালি দিতে পারেন, কিন্তু আমাদের কথা শুনতে হবে। গান তো আমরাই আয়োজন করেছি, রবীন্দ্র রচনা পাঠের আয়োজনও আমাদের। দুটোই আপনাদের শুনতে হবে। বগুড়ার দর্শক সম্পর্কে আমার অনেক উঁচু ধারণা। এই ঘটনায় যে সেই ধারণা নষ্ট হয়েছে তা বলবো না।“ দর্শক একদম চুপ। অনুষ্ঠান ভালো মতো শেষ হোল। শেষে সব সময় থাকতো জাতীয় সঙ্গীত। কাকু জাতীয় সঙ্গীতের আগে মাইক নিয়ে বললেন,” সবাই জাতীয় সঙ্গীতের সাথে সুর মেলাবেন, আস্তে আস্তে নয় গলায় যত জোড় আছে তা দিয়ে। আর যদি কেউ বলেন জাতীয় সঙ্গীত মুখস্থ নেই, তবে তাঁর লজ্জিত হওয়া উচিৎ।“ শুরু হোল জাতীয় সঙ্গীত। মাঠের কয়েক হাজার দর্শক গলা ছেড়ে বগুড়া শহর কাঁপিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইলো। অভাবনীয়। আমার শোনা সেটা ছিল শ্রেষ্ঠ জাতীয় সঙ্গীত।

কাকুর শেষ জীবনে একবার স্ট্রোক করার পরেও তাঁর জীবনীশক্তি থামে নি। সেই একইভাবে ছুটে গেছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। আমার বাসা আর কাকুর শেষ নিবাস খুব কাছাকাছি ছিল। তাই আমাদের আসা যাওয়া ছিল বেশ নিয়মিত। কাকু আমার সংগ্রহে আমার আরেক আগ্রহ ইমপ্রেশনিস্ট পেন্টিংয়ের অনেক বই দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন। একটা বই পড়তেও নিয়েছিলেন। হয়তো শেষ করতে পারেন নি। বই শেষ হলেই খবর দিতেন, “বইটা শেষ, পরীক্ষা নিতে পারিস।“

ওঁর মতো করে উদ্দীপ্ত করতে আমি কাউকে দেখি নি। আমার স্ত্রী এফ সি পি এসের শেষ পর্বের সেই দুরূহ পরীক্ষা উৎরাতে পারছিল না। কাকু হাসতে হাসতে বললেন,’তোমার ফেলের কোটা পূর্ণ হয়েছে, এবার পাস হবেই”।
অবাক ব্যাপার, তাই হয়েছিলো।

তারপর সেইসব দিনগুলো হঠাৎ করেই ফুরিয়ে গেলো। শুনলাম,কাকু গুরুতর অসুস্থ।বারডেমের আই সি ইউতে আছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কয়েক দিনের আশা-নিরাশা আর শঙ্কা ছাড়িয়ে একদিন সত্যিই তিনি চলে গেলেন। কোথায়, কার কাছে, কোন দেশে কে জানে? হয়তো তাঁর সারা জীবন খুঁজে ফেরা সেই শান্তির পারাবারের পরমাত্মার সাথে মিলে আনন্দধাম থেকে বাংলাদেশের নতুন সূর্যোদয় দেখছেন আর গাইছেনঃ তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি/ সকল খেলায় করবো খেলা এই আমি। ওয়াহিদ কাকু আমাদের তারুণ্যের ঋত্বিক হয়ে আমাদের স্মৃতিতে বেঁচে থাকুন চিরকাল। ওয়াহিদুল হকরা মরেন না; তাঁরা মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমাদের অন্তরে সঞ্জীবিত থাকেন।

কাকুকে শেষ দেখা দেখতে পারি নি। শহীদ মিনারে যেতে যেতেই শুনলাম কিছুক্ষণ আগে মরদেহ বারডেমের হিমঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ভালোই হয়েছে। আজীবন এই কর্মযোগীকে চোখ মুদে নিষ্প্রাণ অবস্থাটা মানাতো না।

Add comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *