দুর্বৃত্তায়িত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, নৈতিকতার নয় এটা একটা দার্শনিক সংকট?

সাধারনভাবে আমরা মনে করে থাকি সমাজের দুর্বৃত্তায়নের ছাপ পড়েছে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়। এর জন্য দায়ী কিছু মুখ ও আমরা আমাদের মনসচ্ছবিতে উজ্জ্বল করে তুলি। ভেবে তৃপ্ত হই, যাক এরাই হচ্ছে ভিলেন, এদের জন্ম না হলে আমরা পরিশুদ্ধই থাকতাম। বিষয়টা কী এত সরল? কয়েকজন মানুষ একটা পুরো সিস্টেম কে দুর্বৃত্তায়িত করে ফেলতে পারে? যদি না সমাজে এবং পেশার ভিতরে একটা অবজেক্টিভ শর্ত তৈরি না হয়?

এই অবজেক্টিভ শর্ত গুলো কী? আর কীভাবে এগুলো তৈরি হয়েছে সেটার অনুসন্ধান ছাড়া আমরা এই সর্বগ্রাসী সমস্যার মুলে পৌছুতে পারবো না। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা চলছে পাশ্চাত্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আদলে। পশ্চিম যেটাকে ঠিক বলে মনে করে সেটাকেই আমরা বাস্তবায়ন করি। এই ব্যবস্থা সয়ংভু নয় বরং চাপিয়ে দেয়া। সয়ংভু না হওয়ার কারণে যুগ যুগ ধরে সমাজ বিবর্তন, তার দার্শনিক চিন্তা, সাংস্কৃতিক আচার, পারস্পরিক সম্পর্কের পুষ্টি নিয়ে এই ব্যবস্থা বেড়ে উঠতে পারেনি। থেকে গেছে একটা পরগাছা সংস্কৃতি হিসেবে। সমাজের গভীরে কোন চর্চা বা বিজ্ঞান শিকড় গাড়তে না পারলে সেই সমাজ থেকে সেই ব্যবস্থা পুষ্টি নিতে পারেনা, হয়ে থাকে অপূর্ণাঙ্গ, অপুষ্ট, বিকলাঙ্গ। আমরা আজকের যে দুর্বৃত্তায়িত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেখছি সেটা এই উন্মুল সংস্কৃতির বিকলাঙ্গ প্রকাশ। অপ্রাসংগিক হলেও উল্লখ করা যেতে পারে, আমাদের অনেকের সাথে আদর্শিক দূরত্ব থাকলেও ক্ষুদ্র ঋণের বাংলাদেশের যে মডেল বিশ্বে পরিচিতি পেয়েছে এবং এবং সার্থক প্রয়োগ ঘটেছে বাংলাদেশে, কারণ, এই পদ্ধতি এই মাটি থেকেই উৎসরিত হয়েছে।

আমাদের দেশীয় দর্শনের ক্ষেত্র থেকে উন্মুল হয়ে আমরা দুর্বৃত্তায়িত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবজেক্টিভ কন্ডিশন তৈরি করেছি। আমরা আমাদের দীর্ঘ লালিত ভারতীয় দর্শনের কর্ম সংস্কৃতি থেকে ফলাকাঙ্খি পাশ্চাত্য মুনাফা সংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছি।

কর্ম সংস্কৃতিটা কী?

ম্যাট্রিক্স রেভলুসন ছবিটা যারা মন দিয়ে দেখেছেন তাঁদের রামা আর নিও র মধ্যে একটা কথোপকথন আবারো মনে করিয়ে দেই।

Rama-Kandra: That is our karma (কর্ম).
Neo: You believe in karma (কর্ম)?
Rama-Kandra: Karma’s a word. Like “love”. A way of saying ‘what I am here to do.’ I do not resent my karma. I’m grateful for it. Grateful for my wonderful wife, for my beautiful daughter. They are gifts. And so I do what I must do to honour them.

নিওর মুখে “কর্ম” শব্দটা শুনে অবাক লাগারই কথা। এই “কর্ম” বিষয়টা কী? এটা কিন্তু “কাজ” নয়, “কর্তব্য” নয় আরও গভীর কিছু। ভারতীয় দর্শন অনুসারে এই “কর্ম” একটি যোগ বা সাধনা এবং তা নিষ্কাম। অর্থাৎ আমরা যা কিছুই করবো তার ফল আকাঙ্খা করবো না। তাহলেই সেটা হবে “নিষ্কাম”।পাশ্চাত্য কর্ম দর্শন ফলাকাঙ্খি এবং সুখান্বেষী, ভারতীয় দর্শন নিষ্কাম, শান্ত। পাশ্চাত্যের কর্ম –ভোগ, বন্ধন; ভারতীয় কর্ম- যোগ, মোক্ষ।

পাশ্চাত্যের কর্ম জীবন নিয়ে একটা আলেন স্ট্রুগিস হপারের একটা চমৎকার কবিতা আছে।

I slept and dreamt that life is Beauty,
I woke up and found that life is duty.

এই কবিতার সুন্দর একটি বাংলাও আছেঃ

নিদ্রায় দেখিনু হায়! মধুর স্বপন,-

কি সুন্দর সুখময় মানব জীবন।

জাগিয়া মেলিনু আঁখি, চমকিনু পুনঃ দেখি-

কঠোর কর্তব্য ব্রত জীবন যাপন।

নিঃসন্দেহে খুব উচ্চ মার্গের কথা। এই কবিতার বানীকে আমরা কর্ম দর্শন হিসেবে গ্রহণ করতে পারলে মন্দ হতোনা। কিন্তু ভারতীয় কর্ম দর্শন আরও উচ্চ মার্গের। কর্তব্য পালনে কর্তার অহং জ্ঞান থাকে, ফলের দিকে সাগ্রহ দৃষ্টি থাকে, অনেক সময় একটা কঠোরতার অনুভুতিও থাকে আর অন্যের কাছে এক ধরণের বাধ্যবাধকতা থাকে, কিন্তু প্রাচ্যের কর্মযোগী এ সব কিছুর ঊর্ধ্বে, তিনি অনহংবাদি, মুক্তসঙ্গ, সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে নির্বিকার। তিনি আত্মারাম, আত্মতৃপ্ত; তার নিজের কোন কর্তব্য নাই, তিনি সকল কর্তব্য ত্যাগ করে কর্মে নিজেকে সমর্পণ করেছন। কারণ, কর্তব্য জ্ঞানের প্ররোচনা থাকলে নিষ্কাম হওয়া যায়না।

রবীন্দ্রনাথের কথায়, “যদি কর্তা হতে চাই তবে মুক্ত হতে হবে। ……সেই যোগকেই… কর্মযোগ বলে যে যোগে আমরা অনাসক্ত হয়ে কর্ম করি। অনাসক্ত হয়ে কর্ম করলেই কর্মের উপর আমার পূর্ণ অধিকার জন্মে–নইলে কর্মের সঙ্গে জড়ীভূত হয়ে আমরা কর্মেরই অঙ্গীভূত হয়ে পড়ি, আমরা কর্মী হই নে।“

রবীন্দ্রনাথ একটা উদাহরণও দিয়েছেন,” ঘোড়া গাড়ির সঙ্গে লাগামে বদ্ধ হয়ে গাড়ি চালায়–কিন্তু ঘোড়া কি বলতে পারে গাড়িটা আমার? বস্তুত গাড়ির চাকার সঙ্গে তার বেশি তফাত কী? যে সারথি মুক্ত থেকে গাড়ি চালায় গাড়ির উপরে কর্তৃত্ব তারই। অতএব …… কর্মকে সাধন করতে গেলে আসক্তি পরিহার করে আমাদের কর্ম করতে হবে।“

একটা প্রশ্ন নিশ্চয় সবাইকে কুরে কুরে খাচ্ছে, এও কী সম্ভব? কোন কিছুর আকাঙ্খা না করে কাজ করে যাওয়া? এ যে সোনার পাথরবাটি!

মোটেও নয়। নিষ্কাম কর্মকে অনেকটা স্পোর্টিং আট্যিচিউড এর সাথে তুলনা করা যায়, যেখানে জয় বা পরাজয় বড় নয়। খেলার মাঠে দুদল বালক যখন দুটো দলে ভাগ হয়ে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলে, সেটা কী এই জয় পরাজয়ের ঊর্ধ্বে নয়? খেলাটাই সেখানে মুখ্য। এই খেলা তাই নিষ্কাম। আবার দেখুন জুয়া খেলা, এর মধ্যে আছে লোভ, জয়ের আকাঙ্খা, এ খেলা কখনো নিষ্কাম নয়।

তাহলে আমাদের জীবন-জীবিকা চলবে কীভাবে? যদি শুধু নিষ্কাম কর্মই আমাদের ব্রত হয়?

আজকের আধুনিক ব্যবস্থাপনাতেও বলে জীবিকার জন্য যে কাজ করি সেটাতে আছে দুটো ফ্যাক্টর, একটা হাইজিন ফ্যাক্টর যার মধ্যে আছেঃ বেতন, পদন্নোতির সম্ভাবনা, কাজের পরিবেশ, চাকুরীর নিশ্চয়তা, কোম্পানি পলিসি ইত্যাদি। যেগুলো একটা চাকুরী দাতা কে নিশ্চিত করতেই হবে। আর দ্বিতীয়টা মটিভেশনাল যা কাজের প্রতি আনন্দ জাগিয়ে তুলবে। এমন তো কোন চাকরি নেই যেখানে বেতন হয়না। তাই কেউ যদি বলে যে সে বেতনের জন্য কাজ করে তবে নিশ্চিত কাজে তার আনন্দ নেই। জীবিকা থেকে উপার্জন অনুসঙ্গ, উপার্জন টাই মুখ্য নয়। উপার্জন কে অনুসঙ্গ মনে করতে পারলেই তা নিষ্কাম কর্মে উন্নীত হবে।

এখনো মনে করা হয় যে কাউকে বেশী বেতন দিলে, বেশী টাকা পয়সা দিলে, ইন্সেটিভ দিলে সে ভালো থেকে ভালতর কাজ উপহার দিতে থাকবে; তারপর আরও ইন্সেটিভ আরও ভালো কাজ এইভাবে চক্রাকারে চলতে থাকবে।

এম আই টি তে একটা চমৎকার গবেষণা হয়েছিলো। কয়েকদল ছাত্রছাত্রীকে ভালো কাজের জন্য আর্থিক পুরস্কারের ব্যাবস্থা করা হোল এবং তাঁদের নানা ধরণের কাজ দেয়া হোল। পুরস্কারের নীতি ছিল যত ভালো কাজ তত বেশী টাকা। বেশ মজার তাইনা? ফলাফলটা মজার। দেখা গেলো যদি কাজটা হয় নিছক শারীরিক পরিশ্রমের যেখানে কোন মাথা খাটানোর সামান্যতম সুযোগও নেই তবে, ভালো কাজ >বেশি টাকা >ভাল কাজ এই তত্ত্ব খুব ভালো কাজ করে। কিন্তু সামান্যতম মাথা খাটানোর বিষয় থাকলে ভালো কাজের পর বেশী টাকা দিলে উল্টো ফল হয়। মানে ভালো কাজ > বেশী টাকা > খারাপ কাজ

এই ফলাফলে সবাই এত বিস্মিত হয়েছিলো যে পরে অনেক টাকা পয়সা খরচ করে আরেকটা বিরাট পরিসরে গবেষণা করা হোল ভারতের মাদুরাইতে। ফলাফাল একই।

কারণ কী? কারণ আমরা টাকার জন্য ভালো কাজ করিনা, করি অন্তর্গত তাড়নায়, এটাই নিষ্কাম কর্ম। মানুষ পুঁজিপতির মুনাফা বাড়ানোর জন্য এক ফোটাও পরিশ্রম করতে চায়না, পরিশ্রম করতে চায় আরও অনেক উচ্চতর আদর্শের জন্য। তাই পুজির সেবকরাও এখন “কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি” “দিনবদল” এসব মুখরোচক শ্লোগান নিয়ে শুধু ক্রেতার কাছেই না তাঁদের কর্মীদের সামনেও আসে। মাইলের পর মাইল গাছ লাগায়, স্কুল বানায়, অ্যাসিড দগ্ধদের জন্য কনসার্ট করে।

উইকিপিডিয়া আর লিনাক্স এর মতো মুক্ত সফটওয়্যার তৈরি হয়েছে দারুণ সব পেশাজীবীদের স্বেচ্ছাশ্রমে। যে অভ্র দিয়ে লিখছি, এটাও। এটাই নিষ্কাম কর্ম। কিছুই পায়নি এই নির্মাতারা। অর্থ-যশ বা অন্য কিছু পাওয়ার আকাঙ্খা থেকে কেউ এগুলো করেনি।

পাশ্চাত্যের কর্ম দর্শনের জ্বালায় কি কেউ তৃপ্ত? এই ইদুর দৌড়ে তো সবাই ক্লান্ত। এবং শেষ জীবনে হিসাব মেলাতে যেয়ে দেখে লাভের ঘরে শুন্য। পাওয়ার পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে আসলে কিছুই পাওয়া হয়নি।

আমরাও হয়ে পড়েছি ফলাকাঙ্খি, আর ফলটা হচ্ছে অর্থ আর সম্পদের পাহাড়। যার পাহাড় যত উঁচু সে তত সফল। পেশাকে নিষ্কাম কর্মের আদর্শে উত্তীর্ণ করা সহজ নয়, আরো এক মহত্তর আদর্শ তার জন্য তৈরি করতে হবে, তবেই ফালাকাঙ্খি মানুষ সত্যিকারের কর্মী হয়ে উঠবে।

নিষ্কাম কর্মের সেই মহত্তর আদর্শের জয়গান পাই আমরা রবীন্দ্রনাথেও।

কী পাই নি তারি হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি।

আজ হৃদয়ের ছায়াতে আলোতে বাঁশরি উঠেছে বাজি॥

ভালোবেসেছিনু এই ধরণীরে, সেই স্মৃতি মনে আসে ফিরে ফিরে,

কত বসন্তে দখিনসমীরে, ভরেছে আমারি সাজি॥

নয়নের জল গভীর গহনে আছে হৃদয়ের স্তরে,

বেদনার রসে গোপনে গোপনে সাধনা সফল করে।

মাঝে মাঝে বটে ছিঁড়েছিল তার, তাই নিয়ে কেবা করে হাহাকার–

সুর তবু লেগেছিল বারে-বার, মনে পড়ে তাই আজি॥“

আমরা ফলাকাঙ্খি হয়ে সুখান্বেষী হয়েছি, হয়েছি কর্মের দাস, তার প্রভু হতে পারিনি। এই দার্শনিক দারিদ্র্যই জন্ম দিয়েছে দুর্বৃত্তায়ন। এই অবস্থা এমনিতেই কাটবে না, কাটবে তখনই যখন আমরা পেশায় একদল চিন্তাশিল নেতৃত্ব পাবো, যারা আমাদের নতুন, অর্থবহ জীবনের পথ দেখাবে, উচ্চতর আদর্শের স্বপ্ন দেখাবে।

Share

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Feeling social? comment with facebook here!

Subscribe to
Newsletter