বাংলাদেশের আর্সেনিক দূষণ : যাদের দায়ভার তারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে; আমরা কেন ক্ষতিপূরণ পাবো না?

আমরা অনেকদিন থেকেই শুনছি বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ জলাধার প্রাণঘাতী আর্সেনিকে দুষিত হয়ে গেছে। পানের অযোগ্য হয়ে গেছে সে পানি, ৭ কোটি ৭০ লক্ষ দেশবাসী এ দূষণে আক্রান্ত। দূষণের কারণে বেড়েছে মৃত্যুহার, প্রকোপ বেড়েছে ডায়াবেটিস, ক্যানসার আর রক্তচাপের মতো প্রাণঘাতী নিরাময় অযোগ্য রোগ। বাংলাদেশের প্রত্যেক পাঁচটি মৃত্যুর একটি মৃত্যু হচ্ছে আর্সেনিকের কারণে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই বিপর্যয়কে বলেছে “Largest mass poisoning in history”। কিন্তু যে বিষয়টি আমরা জানি না তা হচ্ছে, এটা কেমন করে হোল? কে এর জন্য দায়ী? সেই ব্যাক্তি বা গোষ্ঠী বর্গ কোন কৌশলে তাঁদের এবং তাদের এই দুষ্কর্মকে এতদিন আড়াল করে রেখেছে? কেনই বা এ নিয়ে কেউ এখনো কোন প্রশ্ন তুলছেনা? আসুন এনিয়ে এক চমকপ্রদ অনুসন্ধানে সামিল হই।

আর্সেনিক কী?

আর্সেনিক একটি রাসায়নিক মৌল যা ধাতু এবং অধাতুর মাঝামাঝি একটি পদার্থ। এগুলোকে বলে মেটালয়েড। আর্সেনিক একইসাথে ধাতু এবং অধাতুর কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য ধারন করে। আর্সেনিক একটা শক্তিশালী বিষ, খুব সামান্য পরিমাণে তীব্র বিষক্রিয়া হয়। মাত্র ১০০ মিলিগ্রাম আর্সেনিক একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে। ১০০ মিলিগ্রাম কতটুকু? ১ টেবিল চামুচের ২০ ভাগের ১ ভাগের ওজন ১০০ মিলিগ্রাম। পৃথিবীতে ব্যপকভাবে যত মৌল ছড়িয়ে আছে আর্সেনিক পরিমানের দিক থেকে সেগুলোর মধ্যে ২০ তম। পৃথিবীর বহির্ভাগের মাটি, পাথর, অন্যান্য শিলা, আকরিক সব কিছুর সাথেই কম বেশী আর্সেনিক মিশে আছে। আধ কাপ চিনির মধ্যে যদি দুই দানা লবন থাকে তবে লবনের যেমন ঘনত্ব হবে, পৃথিবীর বহির্ভাগের আর্সেনিকের ঘনত্বও তেমন।
প্রকৃতিতে মাটি এবং শিলাতে ২-৫ পি পি এম এর মতো আর্সেনিক থাকে। কিছু কিছু যৌগে অনেক বেশী পরিমাণে আর্সেনিক থাকে যেমন, আরসেনোপাইরাইট, আরসেনোলাইট। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতেও প্রকৃতিতে আর্সেনিক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি বছর প্রকৃতিতে যে পরিমাণে আর্সেনিক ছড়িয়ে পড়ে তার এক তৃতীয়াংশ আসে প্রাকৃতিক উৎস থেকে, এর অধিকাংশই আসে অগ্ন্যুৎপাত থেকে।

আর্সেনিক কেন আমাদের শরীরের জন্য বিষবৎ?

আমরা কেমিস্ট্রির পিরিয়ডিক টেবিলের কথা জানি। প্রত্যেকটি রাসায়নিককে তার বৈশিষ্ট্য এবং ভর অনুযায়ী সাজিয়ে এই টেবিল তৈরি করা হয়। আমরা খুব আকাদেমিক ডিটেলে না যেয়ে টেবিলটা দেখি।

পিরিওডিক টেবিল

টেবিলের ১৫ নম্বর কলামের তৃতীয় মৌল টা আর্সেনিক। একটা সরল বিষয় মনে রাখলে বিষয়টা বুঝতে সহজ হবে। প্রত্যেক কলামে যে মৌল গুলো আছে সেগুলোর বৈশিষ্ট্য একই রকম। ১৫ নম্বর কলামে ৫ টি মৌল আছে। এই পাঁচটি মৌল একই বৈশিষ্ট্যের অধিকারি হবে। ঠিক আর্সেনিকের উপরেই আছে ফসফরাস। তার মানে আর্সেনিক আর ফসফরাস একই ধরনের খুব কাছাকাছি মৌল। সমস্যা এখানেই। আমাদের শরীরের ডি এন এ র অন্যতম উপাদান ফসফরাস।

ডি এন এ র গাঠনিক চিত্র

প্রকৃতিতে আর্সেনিকের ঘনত্ব ফরফরাসের চাইতে তুলনামুলক ভাবে বেশী হয়ে গেলে ডি এন এ তে আর্সেনিক যেয়ে ফসফেট (ফসফরাস) কে স্থানচ্যুত করে ফেলে। তার ফলে ডি এন এ হয়ে যায় বিকৃত আর বিকৃত ডি এন এ সমস্ত শারীরবৃত্তকে বিকৃত করে ফেলে। ভুল এনজাইম তৈরি হয়, ভুলভাবে কোষ বিভাজিত হতে থাকে, ভুল সিগন্যাল তৈরি হয়, ভুল প্রোটিন তৈরি হতে থাকে, ভুল বংশগতি সন্তানের শরীরে প্রোথিত হয়ে যায়।
এছাড়াও আমাদের শরীরের কোষ প্রাচীরের একটি অন্যতম উপাদান ফসফরাস। এই কোষ প্রাচীরের ফসফেটকেও আর্সেনিক স্থানচ্যুত করে ফেলে। একারনেই আর্সেনিকে আক্রান্ত হলে চামড়ায় ঘা দেখা যায়।

একটি কোষ প্রাচীরের ছবি

আকরিক থেকে তামা, লোহা, সিসা ও সোনা উৎপাদনের সময়েও আর্সেনিক একটা উপজাত হিসেবে তৈরি হয়। এই আর্সেনিক নানাভাবে পানিতে মিশতে থাকে। সারফেসের পানির চাইতে ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিক বেশী থাকে। যেহেতু মাটি এবং শিলাতে আর্সেনিক প্রাকৃতিক ভাবে থাকে তাই পানি চুইয়ে গভীর স্তরে পৌছুতে পৌছুতে নানা রাসায়নিক পানিতে দ্রবীভূত হতে পারে, তবে এভাবে ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক দূষণ ঠিক ব্যাখ্যা করা যায়না, কারণ প্রাকৃতিক ভাবে বাংলাদেশের মাটি এবং শিলাতে আর্সেনিকের পরিমান কম। তাহলে কীভাবে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যাপকভাবে দুষিত হয়ে গেলো? এই অনুসন্ধান কখনো বাংলাদেশে করা হয়নি, সুচতুর ভাবে চেপে যাওয়া হয়েছে এক মূর্খের মতো চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তকে যা শতাব্দীর জন্য দুষিত করে দিয়েছে ভূগর্ভস্থ পানিকে। এর জন্য বাংলাদেশ পায়নি কোন ক্ষতিপূরণ। তথাকথিত আর্সেনিক বিশেষজ্ঞরা জাতির কাছে থেকে লুকিয়েছেন এক ঘৃণ্য ইতিহাস।

আসুন দেখি কীভাবে ভূগর্ভস্থ পানির আর্সেনিক দূষণ হয়।

আর্সেনিকের অনেকগুলো ধরণ আছে। এর মধ্যে কিছু আছে পানিতে অদ্রবণীয় তাই সেগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তা না করলেও চলে। পানিতে দ্রবণীয় আর্সেনিককেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাটি বা শিলার গায়ে থাকা বাইন্ডিং সাইট শক্ত করে বেঁধে রাখে। তাই কোন স্বাভাবিক ঘটনায় প্রাকৃতিক ভাবে ভূগর্ভস্থ পানি আর্সেনিকে দুষিত হতে পারেনা, যদিনা কোন অস্বাভাবিক ঘটনা না ঘটে। শতাব্দীর পর শতাব্দী আমাদের পানির স্তর দূষণ ছাড়া থাকলো, আর কী এমন হোল যে, পৃথিবীর ভয়াবহতম মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয় হয়ে গেলো? আর সেই মানুষগুলোই বা কারা?

শয়তানি প্ররোচনা

বাংলাদেশে ডায়রিয়ার প্রকোপ কমানোর জন্য ইউনিসেফ এবং বিশ্ব ব্যাংক মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ সরকারকে পরামর্শ দিল; পান করবার জন্য ভূগর্ভস্থ পানি ব্যাবহারের। সারা দেশে নির্বিচারে বসানো হোল ৮০ লক্ষ টিউব ওয়েল। এই পরামর্শের আগে করা হোল না কোন সমীক্ষা; নেয়া হলনা কোন ভূতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিদদের সমন্বিত পরামর্শ। উপেক্ষা করা হল জনগোষ্ঠীর চিরায়ত অর্জিত জ্ঞান। চাপিয়ে দেয়া উটকো পরামর্শ এক দশকেই ধ্বংস করে দিল সম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, আর্সেনিক দূষণে আক্রান্ত হোল কোটি কোটি মানুষ। হাইপেরটেনশন, ডায়াবেটিসের ব্যাপক মহামারী শুরু হোল দেশে। অনেকে আক্রান্ত হল প্রাণঘাতী ক্যান্সারে।

কীভাবে পানিতে মিশলো আর্সেনিক?

মাটি বা শিলাতে যে আর্সেনিক আটকে থাকে সেগুলো থাকে ঋণাত্মক চার্জ যুক্ত। পানির স্বাভাবিক পি এইচ থাকলে এই ঋণাত্মক চার্জ যুক্ত আর্সেনিক দৃঢ় ভাবে মাটি বা শিলার সাথে এঁটে থাকে। কোন কারণে পানির পি এইচ বেড়ে গেলে অর্থাৎ পানির চার্জ ধনাত্মক হয়ে গেলে ঋণাত্মক আর্সেনিকের বন্ধন শিথিল হয়ে মাটি এবং শিলার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পানিতে মিশে যায়। পি এইচের এই মাত্রা বেড়ে যেতে পারে যদি ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রা হঠাৎ করেই কমিয়ে ফেলা হয়, ঠিক যেটা করা হয়েছে ৮০ লক্ষ টিউব ওয়েল দিয়ে ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি উঠিয়ে। টিউব ওয়েলের পাইপ যেন তেন ভাবে ভূগর্ভে ঢোকাতে যেয়ে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে জীবাণুর দূষণ সেই জীবাণু ভূগর্ভের অরগানিক কার্বনে পরিপুষ্ট হয়ে নির্গত করেছে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস, এই গ্যাস বিপুলভাবে বিযুক্ত করতে শুরু করেছে মাটি আর শিলা থেকে আর্সেনিক। এই প্রক্রিয়া আপনা আপনি ঠিক হতে সময় লাগবে কতদিন কেউ জানেনা। পানির এই দূষণ ঠিক হতে সময় লাগতে পারে ক্ষেত্র বিশেষে ১০-১০০ বছর। এমনকি সহস্র বছর।

এই দায় কিন্তু বিশ্ব ব্যাংক বা ইউনিসেফ নেয়নি। বাংলাদেশে আর্সেনিক নিয়ে সব প্রকাশিত রিপোর্টে চেপে যাওয়া হয়েছে দূষণের কারণ। যাদের কারণে এই দূষণ ঘটলো এর ক্ষতিপূরণ এবং দায় দায়িত্ব সেই বিশ্ব ব্যাংক এবং ইউনিসেফের। কিন্তু কোন ক্ষতিপুরনের ধারে কাছে না যেয়ে সেই আমাদেরকেই ৩৩ মিলিয়ন ডলারের ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হোল সেই বিশ্ব ব্যাংক থেকে যেন এই প্রাণঘাতী পরিবেশ বিপর্যয়কারী অবস্থা বাংলাদেশ মোকাবেলা করতে পারে।

আমরা কেন ঋণ নেবো? আমরা কেন ক্ষতিপূরণ পাবো না। এই দায় তো আমাদের না। আমাদের জনগন তো মূর্খের হাতে পরা গিনিপিগ নয়। এই মানবিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ীদের খুঁজে শাস্তি দিতে হবে। ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সব আক্রান্ত এবং আর্সেনিক দূষণে নিহত সব পরিবারকে। এই দায় বিশ্ব ব্যাংক আর ইউনিসেফের।

সময় এসেছে আওয়াজ তোলার। আসুন আমরা এই বীভৎস অন্যায়ের প্রতিবাদ করি। ঘৃণা জানাই তাদের যারা দেশের মানুষের স্বার্থকে জেনে হোক না জেনে হোক উপেক্ষা করেছে, জলাঞ্জলি দিয়েছে।

রেফারেন্সঃ

Click This Link

Click This Link

Click This Link

Click This Link

Click This Link

Share

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Feeling social? comment with facebook here!

Subscribe to
Newsletter