বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমছে কেন?

বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমছে কেন?
Pinaki Bhattacharya

ভারতে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা প্রচারণা আছে যে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমছে কারণ তাঁরা বাংলাদেশে মুসলমানের নির্যাতনের কারণে থাকতে পারেনা তাই তাঁরা দেশত্যাগ করে। এই বয়ানের পক্ষে তাঁরা সবসময় সওয়াল করে। আমি অস্বীকার করছিনা যে বাংলাদেশে হিন্দুরা নির্যাতিত হয়। কিন্তু নির্যাতনের কারণে দেশত্যাগ করায় হিন্দুদের সংখ্যা কমছে এটা কোনভাবেই তথ্য সমর্থন করেনা।

বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমার দুইটা প্রধান কারণ।

১/ ভারতের হিন্দুত্ববাদ ভারত রাষ্ট্রকে হিন্দুদের পিতৃভূমি এবং পবিত্রভুমি বলে দাবী করে। তাই এই রাষ্ট্র অভারতীয় রাষ্ট্রে বসবাসরত সংখ্যালঘু হিন্দুদের মনে একটা বিকল্প নাগরিকত্বের সম্ভাবনা জাগুরুক রাখে। তাঁরা ভারত রাষ্ট্রকে অবচেতনে নিজের পলিটিক্যাল এজেন্ট হিসেবে ভাবতে থাকে। ভারত রাষ্ট্র হিন্দুত্ববাদ দিয়ে তাঁদের এক তীব্র ধর্মিয় জজবায় আকর্ষণ করতে থাকে। একইভাবে শ্রীলঙ্কান তামিলদের ভারতে মাইগ্রেশনের একটা ট্রেন্ড আছে।

নেপাল থেকে হিন্দুদের তো ভারতে মাইগ্রেশন হয়না। কারণ তারাই তাঁদের রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

২/ হিন্দু জনগোষ্ঠীর প্রজনন হার কম। ১৯০১ সাল থেকে হিন্দুদের প্রজনন হার মুলত ২-৫ শতাংশ। ১৯৪১ সালেই তা একবার ১০% এর উপরে উঠেছিল। মুসলমানদের প্রজনন হার ১৯৪৭ এর পর থেকেই ২০% এর উপরে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে খ্রিস্টান এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সংখ্যা বাড়ছে। এমনকি শেষ সেনসাসে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী মুসলমানদের চাইতে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ধর্মীয় নির্যাতনই যদি জনসংখ্যা কমার একমাত্র কারণ হতো তাহলে বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টান জনসংখ্যা বাড়ার কোন কারণ ছিলোনা।

তাহলে বাংলাদেশে ধর্মীয় নির্যাতন নিয়ে কি আমাদের কিছুই বলার নাই? নিশ্চয় আছে।

এই সমস্যা আসলে কোন ধর্মীয় সমস্যা নয়। এই সমস্যা আসলে রাষ্ট্র গঠনের সমস্যা। একটা ঠিকঠাক রাষ্ট্র বানাতে পারলে এই সমস্যা থাকতোনা। এপার ও ওপারের স্যেকুলারেরা মনে করে, বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক প্রমাণ করতে না পারলে বুঝি বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে হিন্দু বা হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের আর কোন ব্যাখ্যা দেওয়া যাবে না। হিন্দু যে কারণেই নির্যাতিত হোক তাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের হাতে সংখ্যালঘু হিন্দুর অত্যাচার নির্যাতন হিসাবে ব্যাখ্যা যেন করতেই হবে। হিন্দুর নির্যাতন মাত্রই সাম্প্রদায়িকতা প্রমাণ করবার অভ্যাস থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। হিন্দু যে কারণেই নির্যাতিত হোক তাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের হাতে সংখ্যালঘু হিন্দুর অত্যাচার নির্যাতন হিসাবে ব্যাখ্যা করা যাবেনা। এটাই ওয়ার অন টেরর প্রোজেক্টের বয়ান। যার লক্ষ্য হচ্ছে মুসলমানদের বর্বর, পরধর্মে অসহিষ্ণু , ভিন্নচিন্তার প্রতি খড়গহস্ত হিসেবে দেখানো।

বাংলাদেশের হিন্দুদের নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে হিস্যা দাবী করতে হবে। অথচ অবাক বিষয়, বাংলাদেশের হিন্দুরা নাগরিক হিসেবে নয়, বরং হিন্দু হয়ে আলাদা সুরক্ষার দাবি তুলছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাংলাদেশে হিন্দুদের জন্য আলাদা আসন দাবি করেছে। বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট আরও স্পষ্ট ভাবে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা, পৃথক মন্ত্রণালয় ও সংসদে ৬০টি সংরক্ষিত আসনের দাবি জানিয়েছে।

এটা ভুলে গেলে চলবেনা, বাংলাদেশে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের শাসন চলছে সেই শাসকদের অংশ হিসেবে হিন্দুরাও জাতীয় সংখ্যাগুরু। বাঙালি জাতির অংশ হিসাবে তার সম্প্রদায়গত অবস্থান নির্যাতিতের নয়।

বাংলাদেশে যে ফ্যাসিস্ট শাসন জনগণের উপরে চেপে বসেছে তার ভিত্তিকে প্রশ্ন করতে না শিখলে আমরা কখনোই বাংলাদেশকে একটা অগ্রসর রিপাবলিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারবোনা। হিন্দু নির্যাতনের ফয়সালা তো দূর কি বাত।

বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমছে কেন?

লেখাটির ফেইসবুক ভার্সন পড়তে চাইলে এইখানে ক্লিক করুন

Print Friendly, PDF & Email
  • 1.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.6K
    Shares