March 31, 2020

আপনারা সকলেই এই ছবিটা দেখেছেন। অসংখ্যবার। যদি গুগলে সার্চ দেন তবে দেখবেন, ইন্টারনেটে এই ছবিটি বাংলাদেশে মুসলিমদের হাতে মসজিদের ভিতরে এক হিন্দু হত্যার ছবি হিসেবেই পরিচিত।

অসংখ্য ব্লগে এই ছবিকে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের চিত্র হিসেবে। নিচে দেখুন, গুগলে সার্চ দেয়ার পরে এই ছবি ব্লগে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

সাধারণভাবে ইংরেজিতে ছবিটির বর্ণনায় আছেঃ

“In the photo above, Vimal Patak a Bangladeshi born Hindu , was beaten to death in a mosque with sticks as the Muslim mullahs chanted “Kill the Kafir!”

উপরের ছবিতে বিমল পাঠক একজন বাংলাদেশি হিন্দু, তাকে মসজিদে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, মুসলিম মোল্লারা সেই সময় “কাফির হত্যা কর” বলে চিৎকার করছিল।

 

গুগলে ইমেজ সার্চে এই ছবিটা আপ লৌড করে  “hindus in Bangladesh” লিখে সার্চ দিলে কী আসে দেখুন। লিঙ্ক ঃ http://bit.ly/1UrjcTs

ওয়েল মডারেটেড কোন ব্লগে এই ছবিটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ২০০২ সালে মুক্তমনায় একটি লেখায়, জনৈক রাহুল গুপ্ত “Ethnic Cleansing In Bangladesh”  নামে এই লেখাটা লেখেন। সেই লেখায় হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের কিছু সত্যি ঘটনা ও ছবির সাথে এই ছবিটিও দেয়া হয়েছিল। ক্যাপশনে লেখা ছিল-

Fig: A Hindu being beaten by Muslims in a mosque in Bangladesh. He was captured outside the mosque while going home. After Friday prayers were over, the Muslims came out and grabbed the first Hindu they could. Mr. Vimal Patak a Bangladeshi born Hindu was beaten to death with sticks as the Muslim mullas (priests) chanted “kill the Kafir!” (non-muslim). With folded hands he begged for his life and died a brutal death.

সংশ্লিষ্ট লেখার লিঙ্কঃ http://bit.ly/1JQ1jaV

ছবি ও ক্যাপশন যেভাবে দেয়া ছিল মুক্তমনায়।

পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারছেন ইন্টারনেটে এই ক্যাপশনটা মুক্তমনার লেখা থেকেই এসেছে। আন্ডারলাইন করা অংশটি দেখুন। মুক্তমনার লেখাটি ছিল বিশুদ্ধ চোস্ত ইংরেজিতে। তাই এটা বুঝতে সমস্যা হয়না কাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই লেখাটি লেখা হয়েছিল।

এই ছবিটা দেখলে বাংলাদেশের একজন হিন্দু অবশ্যই মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন। বাংলাদেশের বাইরের দেশে আছেন এমন হিন্দুরা ক্রোধান্বিত হবেন। বাংলাদেশের একজন মডারেট মুসলিম লজ্জিত হবেন। একজন ভারতীয় মুসলিম তাঁদের উপর প্রতিশোধ মুলক আক্রমণের আশংকায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন। কিছু ফ্যানাটিক মুসলিম হয়তো আনন্দিত হবেন। আর এই দুই সম্প্রদায়ের বাইরের মানুষ মুসলিমদের নির্ঘাত বাজে ভাষাতেই নিন্দা করবেন।

এই এক ছবি দিয়ে উদ্দেশ্য অনেক হাসিল করা হল। দুই দেশের হিন্দু মুসলিমদের মনে পরস্পরের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস আর ঘৃণা উৎপাদন করা গেলো; আর মুসলিম পরিচয়টিকে কলঙ্কিত করা হল।

আসলে এটা কীসের ছবি? আসুন দেখি।

এই ছবিটার ঘটনা ১০ই জুন ২০০০ সাল। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের কর্মীরা একটা সমাবেশ করছিল বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেইটে সেখান থাকে তাঁরা জামাতের কর্মী সন্দেহে দুইজনকে লাঠি সোটা নিয়ে ধাওয়া করে। সেই দুই ব্যক্তি প্রাণের ভয়ে দৌড়ে বায়তুল মোকাররম মসজিদের ভেতর আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে বের করে এনে দুইজনকে নির্মম ভাবে পেটানো হয়। হাত জোড় করে মাফ চাইছে যেই লোকটি তাঁর নাম নুরে আলম সিদ্দিকী, আরেকজন গোলাম কুদ্দুস। ইনকিলাব পত্রিকায় লেখা হয়েছে দ্বিতীয় সেই ব্যক্তি রক্তাক্ত হয়ে মেহরাবে লুটিয়ে পড়ে। সেদিন রক্তপাত হয়েছিল, কিন্তু কোন হত্যাকাণ্ড হয়নি। এই খবর পরদিন ১১ই জুন প্রায় সকল পত্রিকায় আসে। ইনকিলাবে ছবি সহ খবরটি ছাপা হয়। এবার ১১ই জুন ২০০০ সালের সেই ঘটনার উপরে ইনকিলাবের খবর দেখুন।

এবার পুরো পত্রিকাটি দেখুন।

যারা এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে তারপরেও সন্দেহ পোষণ করছেন; তাঁরা আর্কাইভ থেকে ১১ই জুন ২০০০ সালের প্রতিনিধিত্তশিল বাঙলা ও ইংরেজি পত্রিকার কপি সংগ্রহ করে দেখতে পারেন। এখানে প্রথম আলোতে প্রকাশিত খবরটি দেখুন।

মুল খবরটি আরো স্পষ্টভাবে দেখুন। প্রথম আলো অবশ্য লিখে গোলাম কুদ্দুস একজন জামাত নেতা এবং নুরে আলম সিদ্দিকী সেই জামাত নেতার ড্রাইভার।

ইনকিলাবের নুরে আলম সিদ্দিকির সেই ছবিটিই বিমল পাঠক নামে একজন হিন্দুর ছবি বলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এই ছবিটি ইসরাইলের একটি এন্টি মুসলিম ভিডিওতে ব্যবহার করা হয়েছে, বিজেপির তৈরী ভিডিওতেও ব্যবহার করা হয়েছে।

এই ছবি ব্যবহার করে তৈরি ইজরায়েলি ভিডিওর লিঙ্কঃ http://bit.ly/1CgEiOk

প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশে কি হিন্দু নির্যাতন হয়না? নিশ্চয় হয়, কিন্তু সত্যের সাথে উদ্দেশ্যমুলকভাবে মিথ্যা ঘটনা  মিশিয়ে দিলে আখেরে কি সত্য ঘটনার আবেদন ও বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যায়না? ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের কর্মীদের এহেন নির্যাতন কি সমর্থনযোগ্য? মোটেও নয়। তবে এই ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন কারা এবং কাঁদের আশীর্বাদে পুষ্ট সেটা আরেক আলোচনা। সেই আলোচনার সুযোগ এখানে আপাতত নেই।

মুক্তমনা ছবি সহ সেই লেখাটি সরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু অবিকৃত মুল লেখাটি এখনো ওয়েব আর্কাইভে আছে। কিন্তু তাঁরা সেই ভুল ছবি দেবার দায় কখনো স্বীকার করেনি, ভুল স্বীকার করেনি। যেই চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি হয়েছে এই ছবি নিয়ে যা আন্তর্জাতিক সেন্সন্যাল প্রচারনায় ব্যবহৃত হচ্ছে তার দায় কার? যদি সেই ছবিতে সমস্যা থাকার জন্য লেখাটির কিছু অংশ সরিয়ে ফেলা হয়ে থাকে তাহলে সেটা মুক্তমনা প্রকাশ্যে জানালো না কেন? কেনই বা বলল না এই ছবিটা ভুল?

মুক্তমনা কোন সাধারণ কমিউনিটি ব্লগ নয়, সেটা তাঁরা তাঁদের নীতিমালায় ঘোষণা করেছে। তাঁরা ঘোষণা করেছে, “১.২। মুক্তমনা কো্নো চ্যাটরুম, ফোরাম, বন্ধুসভা কিংবা সোশ্যাল কমিউনিটি ব্লগের মত গল্পগুজবের স্থান নয়। এখানে মুক্তমনার উদ্দেশ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ (১.১ দ্রঃ) লেখা এবং তা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনাকে উৎসাহিত করা হয়।” ১.১ দ্রষ্টব্য কী? দেখুন, “১.১। মুক্তমনা বাংলা ব্লগের উদ্দেশ্য যে কোনো ধরনের প্রগতিশীল, বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিবাদী চিন্তাধারার সাথে সম্পর্কযুক্ত রচনাকে প্রাধান্য দেয়া। কাজেই এই ব্লগের সদস্য হতে হলে এবং এখানে লেখা প্রকাশ করতে হলে আপনাকে অবশ্যই মুক্তমনার উদ্দেশ্যের ব্যাপারটি মাথায় রাখতে হবে ।” তার মানে এটা সিরিয়াস ব্লগ। যে কেউ চাইলেই কোন লেখা সেখানে পৌস্ট করতে পারেনা। তাঁদের নীতিমালা দেখুন। লিঙ্কঃ http://bit.ly/1NID5QO একমাত্র দীর্ঘদিন তাঁদের সাথে যুক্ত থাকলেই কোন মডারেশন ছাড়া কেউ লেখা পৌস্ট করতে পারে। এই রাহুল গুপ্তের আর কোন লেখা নেই মুক্তমনায়। বিষয়টা অবিশ্বাস্য। দুম করে এসে একটা পৌস্ট দিয়েই উধাও। এই লেখার দায় থেকে মুক্তমনা অ্যাডমিন কোনভাবেই মুক্ত হতে পারেনা। মুক্তমনা নামে ব্লগটি তাহলে এমন অনৈতিক ও ঘৃণ্য আচরণ করে কাঁদের স্বার্থ রক্ষা করছে? এই প্রশ্ন করা কি অসঙ্গত?