রামপাল ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

রামপাল নিয়ে নানা বিতর্ক চলছে। বিতর্কে যোগ দিয়েছেন পরিবেশবাদী, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট। তর্ক আর তথ্যের বোঝা চাপছে পাঠকদের মাথায়। পরিবেশ, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, ১০ কিলোমিটার আর ৭৪ কিলোমিটার বিতর্কে চাপা পড়ে গেছে এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—জনস্বাস্থ্য। একটা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প জনস্বাস্থ্যের কী কী ক্ষতি করতে পারে? ইআইএ (এনভায়রনমেন্টাল ইমপেক্ট অ্যাসেসমেন্ট) প্রতিবেদনে কি সেই স্বাস্থ্য বিষয়ে বিরূপ অভিঘাতের পর্যাপ্ত পর্যালোচনা হয়েছে? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে অনেক অজানা তথ্য আর ইআইএর মারাত্মক অসম্পূর্ণতা।

জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আলোচনায় ইআইএর ২৭১ পৃষ্ঠায় বলা আছে, প্রকল্পের দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ঘনবসতি নেই, তাই প্রকল্পের আবর্জনা স্থানীয় জনগণের জন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করার কথা নয়। আবার ৪০২ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা আছে, সালফার অক্সাইড, নাইট্রাস অক্সাইড ও সাসপেন্ডেড পার্টিকুলেট ম্যাটার জনস্বাস্থ্যের ওপর লক্ষণীয় প্রভাব ফেলবে। এর মধ্যে আছে আয়ু হ্রাস, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, রক্তচাপ, হার্ট ফেইলিওর ও অ্যাজমা। ২৯১ পৃষ্ঠায় কুলিং টাওয়ারের জন্য স্থানীয় এলাকায় নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে। এ ছাড়া বাকি প্রতিবেদনজুড়ে আছে পেশাগত স্বাস্থ্য সমস্যা বা অকুপেশনাল হেলথ হ্যাজার্ড। ৪০২ পৃষ্ঠার স্বাস্থ্য সমস্যার বর্ণনা পড়তে গিয়ে একটু হোঁচট খেতে হয়। ‘একজন স্বাস্থ্যকর্মীও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা থেকে অ্যাজমা আলাদা করবেন না; রক্তচাপ থেকে হার্ট ফেইলিওরে লাফ দেবেন না।’ প্রশ্ন জাগে, এই অংশটুকু কি যত্ন নিয়ে করা হয়েছে?

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে তৈরি হওয়া স্বাস্থ্য অভিঘাত শুরু হয় শৈশব থেকেই। এর মধ্যে আছে স্থূলতা, ডায়াবেটিক ও হরমোনসংক্রান্ত ক্যানসার। গর্ভাবস্থায় মা বিষাক্ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে এলে বাচ্চার জন্মকালে কম ওজন হতে পারে এবং মা প্রি-একলামসিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন।

শরীরের পাঁচটি সিস্টেমে কয়লা পোড়ানোজনিত দূষণ প্রভাব ফেলে। সেগুলো হলো শ্বাসতন্ত্র, হূৎপিণ্ড, রক্ত সংবহনতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র ও রক্ত। দূষণজনিত শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় শিশুরা। কারণ, তাদের এনজাইম সিস্টেম ও প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল থাকে। এ ছাড়া শিশুরা তুলনামূলক বেশি সময় বাইরে কাটায় এবং তারা শরীরের ওজনের তুলনায় বেশি বাতাস শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করে। কয়লা পোড়ানোর ফলে বাতাসে উঁচু মাত্রার পার্টিকুলেট ম্যাটারিয়াল ও নাইট্রোজেন অক্সাইডের কারণে শিশুদের ফুসফুসের বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং পরিণত বয়সে অবস্ট্রাক্টিভ পালমোনারি রোগে ভোগে।
গবেষণায় নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে, বাতাসে প্রতি ১০ মাইক্রোগ্রাম পার্টিকুলেট পদার্থের পরিমাণ বাড়লে হূৎপিণ্ডের রোগে মৃত্যুহার ১২ থেকে ১৪ শতাংশ বেড়ে যায়। এমনকি স্বল্প সময়ের জন্য পার্টিকুলেট পদার্থে এক্সপোজড হলেও হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, অনিয়মিত হূৎস্পন্দন, এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এক্সপোজড হলে পরিণত বয়স্ক ব্যক্তিদের উচ্চ রক্তচাপ ও ধমনিকাঠিন্য হয়। ইতালির নগরগুলোতে উচ্চ হারে হূৎপিণ্ডের জটিলতাসংক্রান্ত মৃত্যুর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, বাতাসে উচ্চ মাত্রার নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড এই মৃত্যুহার বৃদ্ধির কারণ। এই নাইট্রোজেন অক্সাইড উৎপাদিত হয় কয়লা পোড়ালে।

কয়লা পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট সিসা ও পারদ গর্ভস্থ শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে। যে শিশুদের মা গর্ভাবস্থায় সিসাতে এক্সপোজড হন, তিনি তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডারে ভোগেন। এ ছাড়া পারদের বিষক্রিয়ায় গর্ভস্থ শিশু আক্রান্ত হলে শিশু পঙ্গুত্ব নিয়ে জন্মায়। গর্ভবতী মায়েদের জন্য পারদের কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। যেকোনো মাত্রাই অনিরাপদ।

কয়লা পোড়ানো থেকে তৈরি পারসিস্টেন্ট অরগানিক পলুটেন্টের মধ্যে আছে মারাত্মক ডায়ক্সিন। এমনকি বাতাসে খুবই মৃদু মাত্রায় উপস্থিত থাকলেও এই ডায়ক্সিন হাজার মাইল দূরে গিয়েও বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। বিষক্রিয়ার কারণে হতে পারে ক্যানসার, বংশগতির ধারক জিনে স্থায়ী বিকৃতি, স্নায়ুতন্ত্রে বিষক্রিয়া, জননতন্ত্রে বিষক্রিয়া এবং শরীরে হরমোনের উৎপাদন ও সংবহন বাধাগ্রস্ত করা। কয়লা পোড়ানোর কারণে আরও উৎপাদিত হয় পলিসাইক্লিক অ্যারোম্যাটিক হাইড্রোকার্বন বা পিএএইচ। এই পিএএইচ একটি বহুল পরিচিত ক্যানসার উৎপাদক।

পার্টিকুলেট ম্যাটারিয়াল অসূক্ষ্ম হতে পারে, আবার সূক্ষ্মও হতে পারে। সূক্ষ্ম পার্টিকুলেট ম্যাটারিয়াল আবার বাতাসে ভেসে থাকা বিভিন্ন পদার্থের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অসংখ্য দ্বিতীয় পর্যায়ের বিষাক্ত পদার্থ তৈরি করে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের দূষণ শুধু স্থানীয় এলাকায়ই প্রভাব ফেলে না, এর প্রভাব পড়ে ট্রান্স বাউন্ডারি ও বৈশ্বিক পর্যায়ে। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের অধ্যাপক পল উইকিন্সন বলেছেন, কয়লা থেকে বিদ্যুৎ তৈরির জন্য জনস্বাস্থ্যে দূষণের প্রভাব বিদ্যুতের অন্য যেকোনো উৎসের চেয়ে বেশি।

হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অ্যালায়েন্স ২০০৯ সালে ইউরোপের ৩০টি দেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য উদ্ভূত স্বাস্থ্য সমস্যার প্রথম উপাত্ত প্রকাশ করে। সেই তথ্যে দেখা যায়, সেই সময়ের মধ্যে ১৮ হাজার ২০০টি অকালমৃত্যু হয়েছে, দুই কোটি ৮৬ লাখের শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ হয়েছে, ৪১ লাখ দিন কর্মে অনুপস্থিতির কারণ ঘটিয়েছে। এই স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলায় খরচ হয়েছে ১৫ দশমিক ৫ থেকে ৪২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ইউরো। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের বার্ষিক স্বাস্থ্য অভিঘাত (Source: HEAL expert assessment, see Annex 1 পৃষ্ঠা ১০)

ইউরোপে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দুই দশক ধরে ক্রমান্বয়ে কমছে। ১৯৯০ সালে যেখানে ৩৯ শতাংশ বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপাদিত হতো, সেখানে ২০১০ সালে উৎপাদিত হচ্ছে ২৪ শতাংশ। ক্রিটিক্যাল বা সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করে দূষণ কমানোর চেষ্টার কথা বলা হয়। কিন্তু এখানে শুভংকরের ফাঁকি হচ্ছে, যদি এই দূষণ ঠেকানোর জন্য উন্নত ফিল্টার ব্যবহার করা হয়, তবে প্লান্টের এফিসিয়েনসি কমে। তাই একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অধিক পরিমাণে কয়লা পোড়াতে হয়। ফলে, অধিক পরিমাণে তৈরি হয় অন্যান্য দূষণ, যেগুলো ফিল্টারে ধরা যায় না।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন। ২০১১ সালের অক্টোবরে ৫০০ জন স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আহ্বান জানায়, যেন নতুন কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প না হয়, যেটাতে কার্বন ক্যাপচার ও স্টোরেজের প্রযুক্তি নেই। পাশাপাশি পুরোনো প্রকল্পগুলো ক্রমান্বয়ে বন্ধ করে দেওয়ার আহ্বান জানায়।
স্বাস্থ্য উদ্বেগের এসব বিষয় কিন্তু আমাদের বিপুল আয়তনের ৬৭৬ পৃষ্ঠার ইআইএ প্রতিবেদনে আসেনি, বরং স্বাস্থ্য অভিঘাতের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে অপেশাদার দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়াটারবার্গের একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ১৩৩ পৃষ্ঠার ইআইএ প্রতিবেদনে এই স্বাস্থ্য অভিঘাতের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে এসেছে, শুধু মানুষ নয়, প্রাণীকুলের ওপর সম্ভাব্য অভিঘাত বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। পরিশেষে এই প্রস্তাবিত প্রকল্পের ফলে দক্ষিণ আফ্রিকার এয়ার কোয়ালিটিতে কী কী বিরূপ প্রভাব পড়বে, সেটার জন্য আলাদা সমীক্ষা করার কথা বলা হয়েছে।

অসম্পূর্ণ ইআইএতে জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করা হয়নি। সে কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে এই প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে যদি অস্বাভাবিক স্বাস্থ্য খরচ রাষ্ট্রের মাথায় চেপে বসে, তবে সেটা সরকার, জনগণ, রাষ্ট্র—কারও জন্যই মঙ্গলজনক হবে না।

পিনাকী ভট্টাচার্য: চিকিৎসক ও শিক্ষক, এনভায়রনমেন্টাল টক্সিকোলজি, এআইইউবি।

প্রথম আলোতে ২৪ অক্টোবর ২০১৩ তারিখে প্রকাশিত- মূল লেখাটা পড়তে এখানে ক্লিক করুন

 

Share

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Feeling social? comment with facebook here!

Subscribe to
Newsletter