সিপিবির সাথে আমার ছাড়াছাড়ি

আমার সাথে সিপিবির ছাড়াছাড়ি ঘটেছে। আমার তরফ থেকে নয়, সিপিবির তরফ থেকে। এটা সিপিবির সাথে আমার দ্বিতীয় বিচ্ছেদ। প্রথম বিচ্ছেদ ঘটেছিল ছাত্র অবস্থায়। সেই সময় ১৯৮৯ সালে রাজশাহীতে গিয়ে আমার বহিস্কারের ঘোষণা দিয়েছিলেন বর্তমানের শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ; সাথে ছিল সংগঠন বিভাগের শেখর দত্ত। নুরুল ইসলাম নাহিদ ও শেখর দত্তের মতো সেকালের হেভিওয়েট নেতাকে গিয়ে এই কাজ করতে হয়েছিল; কারণ আমি তখন ছাত্র ইউনিয়নের রাজশাহী জেলার সাধারণ সম্পাদক, এবং রামেকসুর জিএস। আর শুধু আমিই বহিষ্কৃত হয়েছিলাম না। সাথে রাজশাহী জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, ভাইস প্রেসিডেন্ট, রাজশাহী নগরের প্রেসিডেন্ট ও জেনারেল সেক্রেটারিও বহিস্কৃতদের মধ্যে ছিলেন। এদের সকলের মধ্যে একমাত্র আমারই সিপিবির সাথে পরে দ্বিতীয় বিবাহ দীর্ঘ সময় টিকেছিল।

সিপিবিতে অন্য সবার আমার সাথে ক্রমাগত মতবিরোধ হত। কিন্তু কখনোই তারা এমনকি সন্মিলিতভাবে ডিবেইটে আমার মতকে খারিজ করে দিতে পারেনি। সেটা কখনই সম্ভবও হত না । বিতর্কে সিপিবির লোকেরা যখন নিশ্চিতভাবে হারতো তখন তারা গলা কাপায়ে বলতো,কমরেড এইটা ডিবেইট ক্লাব নয়।এর মানে হল তারা হেরে গেছে। যারা সিপিবি করেছেন তারা এই বাক্য অসংখ্যবার শুনেছেন।

আমি ভেবেছিলাম এদেরকে সেকেন্ড হ্যান্ড না, খোদ মার্ক্স পাঠ করালে হয়তো উন্নতি হতে পারে। চাপাচাপি করে শুরুও করেছিলাম। কিন্তু ক্রমশ যখন ধরা পরে যেতে থাকলো এরা মার্কসের কোন লেখা লিটারেচারের ন্যুনতম কিছুই পড়ে নাই, তখন শুরু হল সেই মার্ক্স পাঠেরও বিরোধিতা। আমি পাঠের আগে আর পাঠের পরে এম সি কিউ নিতাম, সেইটা আমার কাছে এখনো আছে। তাই তারা সংশ্লিষ্ট বইটার আলোচনা শুরুর আগে সেই বই সম্পর্কে কী ছাতার উলটাপালটা জানতো সেটার দলিল আছে। অবাক হবেন না এর মধ্যে কমিউনিস্ট পার্টির মেনিফেস্টোও ছিল। সেইটাও পড়ে নাই এরা ঠিকমতো।

এরমধ্যে একালে এম এম আকাশ লিখলেন, তবে ঘটনা যাই ঘটুক প্রগতিশীল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ক্ষেত্রে যা করণীয় সেটা হচ্ছে, ১৯৭১ সালের পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীল সন্ত্রাসী শক্তিকে যদি আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ করেও দুর্বল নিঃশেষিত করতে পারে, তাতে বাগড়া না দেওয়া। (ড. এম এম আকাশ, ‘এই রাউন্ডেও কি শেখ হাসিনা জয়ী হবেন?’ সমকাল, ১৬ মার্চ ২০১৫)

আমি আকাশের নামে নিন্দা প্রস্তাব আনলাম, বললাম এইটা ফ্যাসিস্ট বয়ান। আকাশের বহিস্কার চাইলাম। কিন্তু কেউ আমাকে সমর্থন করলো না। আমি বললাম এইটা কি সিপিবির কেন্দ্রীয় স্ট্যান্ড? যদি সেইটা না হয় তবে আকাশ কীভাবে প্রকাশ্যে এইটা লেখে? কেন আকাশের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব আনা যাবে না। কেউ আমাকে সমর্থন না করলেও যেহেতু আমি একাই বলেছি, তাই সেটা একক প্রস্তাব হিসেবে উর্ধতন কমিটিতে যাবে। আমি মেনে নিলাম। ওই ঘটনার এক বছর পরে আবিষ্কার করলাম আমার সেই একক প্রস্তাব ও উর্ধতন কমিটিতে পাঠানো হয় নাই। আমি সদস্য হিসেবে আমার অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগ আনলাম। তখন তারা আমার নামে এক বস্তা অভিযোগ হাজির করলো, আমি এই বলছি সেই বলেছি, এইটা লিখছি সেইটা লিখছি। আমি বললাম, “আকাশ যদি নিজের যা খুশী তাই লিখতে পারে, আমি কেন পারবো না? কোন যুক্তিতে।” তখন আবার সেই গলা কাপানো ওয়াজ শুরু হল ককহহমরেড এইটা ডিবেটিং ক্লাব না। আরে আমার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও দিবে না, অভিযোগ তো একতরফা হতে পারেনা; সেটা খন্ডানোর সুযোগ দেয়ার বিষয় আছেনা? কিন্তু সেইটা তারা শুনবে না।

আমি বললাম, আচ্ছা আমাকে লিখিতভাবে জানান আমার সম্পর্কে কী অভিযোগ।

তারা আমাকে লিখিতভাবে আমার সম্পর্কে পাঁচটি অভিযোগ জানায়। ভুলে ভরা অসম্পুর্ন বাক্য দিয়ে সেই অভিযোগ পত্রটি আমি এখানে এডিট না করেই আপনাদের সামনে দিলাম। দেখেন আপনারা কিছু বুঝতে পারেন কিনা?

১। ৭ই জুন ২০১৬ তারিখে আপনি লিখেছেনআপনার রাজনৈতিক আকাঙ্খা কে এই মুহূর্তে কোন রাজনৈতিক দল ধারণ করেনা যদি ধারণ না করে তবে কেন এই পার্টির সদস্য হিসাবে আছেন?

২। ৫ই মে ২০১৩ তারিখের হেফাজত ইসলামের ঢাকা তাণ্ডব নিয়ে আপনি লিখেছেন, “৫ই মে আসলে এই মধ্যবিত্ত ভয় পেয়েছিল, ঠিক এভাবেইতো ভয় পাওয়ার কথা যদি শোষক বুঝতে পারে এই কৃষক আর গারমেন্টস কন্যার ছেলেরা যদি একদিন নিজেদের শোষিত বলে চিনে ফেলে!!!! আর এভাবেই নিজের হিস্যাদাবী করে? ৫ই মে তেতো তারাই এসেছিল অন্যপোষাকে যাদের বিপ্লবের ডাক দিয়ে একদিন শহরকে ঘিরে ফেলার কথা।

এতে বুঝা যায় যে, আপনি শোষিতো শ্রেণি এবং সাম্প্রদায়িক শক্তি প্ররচিত কোন সমাবেশ আর সমাজ বিপ্লবের চেতনা সম্পন্ন শক্তিকে একিভূত করে ফেলেছেন।

৩। আপনার ২২ শে জুন তারিখে অন্য লেখায় বদ্রুদ্দিন উমর এরএকটি বক্তব্য সমর্থন করেছেন, যা পার্টি শুলভ নয়।

৪। পার্টির কোন দলিলে ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পরকে আপনার ভিন্নমত আছে তা আপনি কোথাও লিখেননি বা পার্টিতে এই বিষয়ে কোন আলোচনাও তুলেন নি। উপরন্ত এতদবিষয়ে কয়েক লেখায় পার্টিএর প্রতি বিষোদ্গার করেছেন।

৫। আপনার প্রকাশিত বই “ধর্ম ও নাস্তিকতা বিষয়ে বাঙালি কমিউনিস্টদের ভ্রান্তিপর্ব” এর কোথাও আপনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কোন বই বা দলিল এর উল্লেখ করেননি যেখানে এতদবিষয়ে আপনার লেখার সত্যতা আছে।

এই হল অভিযোগ নামা। বলাই বাহুল্য আমি এই অভিযোগনামার জবাব দেইনি। কারণ যারা বুঝার মতো শুদ্ধ বাঙলা পর্যন্ত লিখতে পারেনা, তারা আমার আর্গিউমেন্ট বুঝবে এটা দুরাশা।

সিপিবি সম্পর্কে আমার উপলব্ধি এই, এরা আসলে কোন রাজনীতি করে না, বুঝেও না। এদের প্রগতিশীলতার দৌড় লালপেড়ে শাড়ি আর পাঞ্জাবী পরে পহেলা বৈশাখ উদযাপন আর ঘাড় দুলিয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাওয়া পর্যন্ত। আর মাঝে প্রেসক্লাবে-শাহবাগে হাত বেধে দাড়ানো। এরা টিপিক্যাল ইসলামবিদ্বেষী আরবান মধ্যবিত্ত।

এরা তো কোন ভাবনা-চিন্তার মধ্যে নাই। নেতারা যাচাই বাছাই বিহীন যা দুচার কথা বলে, সেগুলো শুনেই এদের রাজনৈতিক ভাবনা-চিন্তা শানিত করে।

নেতারা কেন বলল, কোথা থেকে বলল, কেন বলল যা বলল তা ঠিক কিনা- এসব প্রশ্ন এদের মনের ভেতর উদয় হয় না। আসলে এরাও এক ধরণের ‘বিশ্বাসী’ মানুষ, “দল যাদের ধর্ম’ আর “নেতা যাদের পয়গম্বর”। সেখানে অবিশ্বাসী পিনাকীর ঠাই হবে কেন? দরকারও নাই। যাক বেচে গেছি!

(কভার ফটোতে যেই ছবি ব্যবহার করা হয়েছে তা সিপিবির গত কংগ্রেসের সংবাদ ছাপিয়েছিল যারা তারা সেই সংবাদের সাথে ব্যবহার করেছিল)

লেখাটির ফেইসবুক ভার্সন পড়তে চাইলে এইখানে ক্লিক করুন

Share

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Feeling social? comment with facebook here!

Subscribe to
Newsletter