সেনাবাহিনীতে রাজনীতি ঢুকানো বা সামরিক ক্যুদেতার সমালোচনা করার অধিকার কি সিপিবি ঘরানার মানুষদের আছে?

না নাই।

আওয়ামী লীগের ইতিহাস বর্ণনা যেমন শুরু হয় ১৯৫২ থেকে ঠিক তেমনি সিপিবির সকল রাজনৈতিক এনালাইসিস শুরু হয় ১৯৭৫ এর নভেম্বর থেকে। যেন তারা আগে কোন ইতিহাস ছিলোনা। সিপিবি বলার চেষ্টা করে জিয়া সামরিক ক্যু করে ক্ষমতায় এসেছিলেন। জিয়া সামরিক বাহিনীতে থেকে রাজনীতিতে এসে খুব অন্যায় করে ফেলেছেন।

অথচ আশ্চর্যজনক হচ্ছে সামরিক বাহিনীতে রাজনীতি ঢূকায় প্রথম এই সিপিবির পুর্বসুরী পাকিস্তানের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি ভারত ভাগের পরে। তারাই প্রথম সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে ক্যুদেতার চেষ্টা করে ১৯৫১ সালে। তারপর থেকেই পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টি সামরিক ক্যুতে যুক্ত থাকার কারণে নিষিদ্ধ হয়।

কমিউনিস্টদের এই অপরিনামদর্শী কাজের পরোক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের সামরিক ইতিহাসে অসংখ্যবার ক্যু হয়েছে কিন্তু একই সামরিক উত্তরাধিকার থাকার পরেও ভারতের সামরিক বাহিনী কখনো ক্যু করেনি।

সেই সিপিবি কোন আক্কেলে সামরিক বাহিনীতে রাজনীতি ঢুকানোর সমালোচনা করে? এমনকি পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি এই ক্যু প্রচেষ্টার কথা স্বীকার করলেও সিপিবি তাদের কর্মীদেরকে এই ক্যু প্রচেষ্টার কথা অখনো জানায় না। আমি নিজেই সিপিবি ছাড়ার পরে এটা জানতে পেরেছি।

জিয়াউর রহমান নয় বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম সামরিক ক্যু করেন মুজিবপন্থী খালেদ মোশাররফ, প্রথম সামরিক আইন প্রশাসকও খালেদ মোশারররফ। এই খালেদ মোশাররফের ক্যুয়ের পরে সিপিবি চাহত্র ইউনিয়ন এতোই খুশী হয় যে সেই খুশী ধরে রাখতে না পেরে মিছিল করে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে ফুল দিয়ে আসে। ৩ রা নভেম্বর হবার আগে তাদের ফুল দেয়ার ইচ্ছা বা সাহস কোনটাই হয় নাই।

খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে যখন কাউন্টার ক্যু হচ্ছে তখন জিয়া অন্তরীন। খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে পাল্টা ক্যু যখন সফল হয় তথনও জিয়া অন্তরীন। যারা ক্যু করেছে তারাই জিয়াকে নেতা বানায়। জিয়া নেতা হতে চায় নাই। বরং তাকে যখন মেজর মহিউদ্দিন মুক্ত করতে আসে তখন জিয়া বলেছিলো আমি অবসর গ্রহণ করেছি আমার পেনশনটা দিয়ে দিও। তারপরেও জিয়া সামরিক অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা দখল করেছে বলে আওয়ামী লীগ গান গায় আর সিপিবি সারিন্দা বাজায়। এমনকি এটাও বলে যে শেখ মুজিব হত্যার পরে জিয়া আর মোশতাক সরকার গঠন করেছিলো।

জিয়াকে জিয়ার দল ডিফেন্ড করুক। কিন্তু সিপিবি সবসময় ইতিহাসের ভুল এবং উদ্দেশ্যমুলক বয়ান হাজির করে। এইটা সিপিবির সতেচন প্রকল্প। সিপিবির বয়ান প্রত্যাখ্যান করে নতুন পরিচ্ছন্ন ইতিহাস হাজির করতে হবে। এটা আমাদের প্রজন্মের জরুরী কাজ। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইতিহাস পরিচ্ছন্ন করার স্বার্থেই লেখাটা লিখতে হলো।

বিএনপির অসংখ্য ভুল আছে। বিএনপির অবশ্যই এক হাজারটা সমালোচনা করা যায়। কিন্তু বিএনপি কি এখন ক্ষমতায়? নাকি ক্ষমতায় যাওয়ার পথে? নাকি বিএনপির কর্মী সমর্থকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে পারবো? তাহলে এই মুহুর্তে বিএনপির গীবত গাওয়ায় কার লাভ হচ্ছে?

বিএনপি আর আওয়ামী লীগ যদি একই হয় তাহলে কেন সিপিবি বিএনপি আওয়ামী লীগের সাথে এরশাদ পতনের আন্দোলন করেছিলো? তখন কি তারা আলাদা ছিলো? আমরা কি ৯০ এর আন্দোলনের সময়ে বাকশাল কত দুঃশাসন করেছিলো সেই আলাপ করেছি? নাকি বিএনপির শেষ টার্মে ইমদু আর গালকাটা কামালের কিচ্ছা শুনাইছি?

আমি এই প্রসঙ্গে মহাভারতের একটা গল্প বলতে চাই।

গুরু দ্রোণাচার্য রাজপুত্রদের অস্ত্রশিক্ষা দিচ্ছেন। এরমধ্যেই তীর ধনুক ছোঁড়া শেখা হয়েছে। গুরু দ্রোণাচার্য এবার শিষ্যদের পরীক্ষা নেবেন।

তিনি দূরে গাছের ডালে একটা কাঠের পাখি রেখে শিষ্যদের পাখির চোখে তীর বিদ্ধ করতে বললেন। প্রথমে এলো বড় রাজপুত্র যুধিষ্ঠির।

সে লক্ষ্য স্থির করার পরে দ্রোণাচার্য জিজ্ঞে​​স করলেন, কী দেখতে পাচ্ছো? যুধিষ্ঠির উত্তর দিলেন, একটা গাছ সেখানে একটা কাঠের পাখি, গাছে জীবন্ত পাখিরাও আছে, পাখির বাসা আছে, গাছে ফল আছে পাখিরা সেই ফল খায়, পিপড়ের বাসাও আছে, গাছের কোটরে সাপ আছে। আমাকে যদি তীর ছুড়তে হয় তাহলে আর কারো ক্ষতি না হয় সেটা দেখতে হবে।দ্রোণাচার্য আবেগে যুধিষ্ঠিরকে জড়িয়ে ধরে বললেন, বৎস, তুমি প্রাজ্ঞ ও হৃদয়বান রাজা হতে পারবে কিন্তু কখনোই একজন ধনুর্বিদ হতে পারবেনা।

এরপর এলো অর্জুন। সে লক্ষ্যস্থির করার পরে দ্রোণাচার্য জিজ্ঞেস করলেন, কী দেখতে পাচ্ছো বৎস। অর্জুন উত্তর দিলো, একটা চোখ গুরু, কাঠের পাখির একটা চোখ। দ্রোণাচার্য জিজ্ঞেস করলো, আর কিছু দেখতে পাচ্ছো বতস? অর্জুন উত্তর দিলো, না গুরু শুধু চোখ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছিনা। অর্জুন ছিলো মিথোলজীর একজন শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ।

আজকের দিনে আপনি যদি সত্যিই বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে অবস্থান নিতে চান, তাহলে বলুন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী?

যদি আপনার মনে হয়, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অবক্ষয়, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। তাহলে আপনি সুশীল হোন, বুদ্ধিজীবি হোন, মাস্টার হোন- রাজনীতি আপনার জন্য নয়।

রাজনীতিতে লক্ষ্য নির্ধারনের এটাই কমিউনিস্ট পদ্ধতি যা অর্জুন হাজার হাজার বছর আগে করেছিলো। কমিউনিস্টরা বলে প্রধান দ্বন্দ্ব নির্ণয়। বাংলাদেশের প্রধান দ্বন্দ্ব কী? একটা ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে জনগনের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

লক্ষ্যস্থির করুন অর্জুনের মতো, কী দেখতে পাচ্ছেন? যদি আপনি ফ্যাসিবাদ দেখতে পান। তাহলে হে অর্জুন লক্ষ্যভেদ করুন। আপনার আর কিছুই দেখার দরকার নেই। দেখা জরুরীও নয়। ইতিহাসরূপী দ্রোণাচার্য আপনার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।

আপাতত আমাদের সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরের দরকার নেই, সিপিবির তথাকথিত শুদ্ধ রাজনীতির দরকার নাই, আমরা চাই লক্ষ্যভেদী অর্জুন যার একমাত্র লক্ষ্য ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করা

Share

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on pinterest
Share on email

One thought on “সেনাবাহিনীতে রাজনীতি ঢুকানো বা সামরিক ক্যুদেতার সমালোচনা করার অধিকার কি সিপিবি ঘরানার মানুষদের আছে?

  1. “আমরা চাই লক্ষ্যভেদী অর্জুন যার একমাত্র লক্ষ্য ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করা”
    Amazing

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Feeling social? comment with facebook here!

Subscribe to
Newsletter