March 31, 2020

বাংলাদেশে যারা একসময়ে রুশপন্থি ছিলেন, তাদের মধ্যে ধর্মের বিষয়ে বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের বিষয়ে এক ধরনের বিরাগ ছিল। অথচ খোদ সোভিয়েত ইউনিয়নেই এমনকী কমিউনিস্ট শাসনামলে ইসলাম ধর্মের চর্চা বাধাহীন ছিল। এমনকী রাষ্ট্রীয়ভাবে গঠিত দেশব্যাপী চারটি মুসলিম বোর্ড ইসলামী বিষয়ে শিক্ষা ও ধর্মীয় জীবনের নানা বিষয়ের দায়িত্ব পালন করতেন। তারা ফতোয়াও দিতেন, যা রাষ্ট্রীয়ভাবেও মেনে চলার

বাধ্যবাধকতা ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে একটা বিশ্বখ্যাত মাদ্রাসাও ছিল। নাম ‘মীর আরব’ মাদ্রাসা। এই মাদ্রাসা এখনো আছে। মীর আরব পুরোনো মাদ্রাসা হলেও সোভিয়েত কমিউনিস্ট জামানায় রাষ্ট্রীয় খরচে ‘ইমাম আল বুখারি ইসলামিক ইনস্টিটিউট’ গঠিত হয় ইসলামী বিষয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য।

খোদ লেনিনের সাথে রাশিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের একটা বিশেষ সুখস্মৃতি আছে। খলিফা হযরত ওসমানের সময় তৃতীয় ও শেষবারের মতো পবিত্র কোরআন শরীফ সংকলিত হয়। তিনি এই সংকলনের পাঁচটি কপি পাঁচ জায়গায় রাখেন। এরমধ্যে এক কপি ছিল সমরখন্দে। তা নানা হাত ঘুরে জারের হাতে এসে পড়ে এবং তিনি সেটা সেইন্ট পিটার্সবার্গের রাজকীয় গ্রন্থাগারে রাখেন। জারের কাছে মুসলমানরা নানা সময় কোরআন শরীফটি তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে ফেরত চাইলেও সেটা ফেরত দেয়া হয় না। এমনকী জারের পতনের পর মেনশেভিক কেরেনেস্কি সরকারের কাছেও চাওয়া হয়; কেরেনেস্কি পাত্তা দেননি। রুশ বিপ্লবের পর মুসলমান সম্প্রদায় সরাসরি লেনিনের সাথে দেখা করে কোরআন শরীফটি ফেরত দেয়ার আবেদন জানান। লেনিন তৎক্ষণাৎ রাজী হন এবং শিক্ষামন্ত্রী লুনাচারস্কির কাছে একটা চিঠি লেখেন। চিঠিটা উৎসাহী পাঠকের কাছে পেশ করছি। চিঠির ভাষা ও বাক্যগঠন লক্ষ্য করুন-

 

“জনকমিশারদের পরিষদ পেত্রোগ্রাদের (সেইন্ট পিটার্সবার্গ) জাতীয় এলাকার আঞ্চলিক মুসলিম কংগ্রেসের নিকট থেকে একটি অনুরোধ পেয়েছে। এতে রাশিয়ার সকল মুসলমানের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সাধারণ পাঠাগারে (বিপ্লবের পরে রাজকীয় গ্রন্থাগারের পরিবর্তিত নাম) রক্ষিত “হযরত ওসমানের পবিত্র কোরআনটি” মুসলমানদের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে। জনকমিশারদের পরিষদ এই ডিক্রি জারি করছে যে, বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সাধারণ গ্রন্থাগারে রক্ষিত “হযরত ওসমানের পবিত্র কোরআনটি” অতঃপর স্থানীয় মুসলিম কংগ্রেসের কাছে হস্তান্তর করা হবে এবং তদনুযায়ী আপনাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশাদি জারি করার অনুরোধ জানাচ্ছি।“

 

জন কমিশারের সভাপতি

 

ভ ই লেনিন

 

এই কোরআন শরীফটি বর্তমানে তার আদি অবস্থান সমরখন্দেই আছে।

এই গল্পের উদ্দেশ্য এটা দেখানো নয় যে, সোভিয়েত কমিউনিস্টরা ধর্মের বিষয়ে জুলুম করেনি। স্ট্যালিন আমলে অনেক জুলুম হয়েছে ধর্মের ওপরে; কিন্তু লেনিন নিজে খেয়ে না খেয়ে ধর্মের বিরোধিতা করাটা অপছন্দ করতেন। তার চিঠির ভাষায় এটা পরিষ্কার, তিনি নিজে হয়তো ধর্ম মানতেন না, কিন্তু ধর্মের প্রতি তিনি সম্মান দেখাতেন। এই প্রসঙ্গে আরেকটা গল্প বলার লোভ সামলাতে পারছি না। আমাদের দেশের আবু জাফর শামসুদ্দিন গেছেন সোভিয়েত ভ্রমণে তার সঙ্গি ছিলেন শ্রীলংকার এক সাবেক মন্ত্রী বদিউদ্দিন আহমেদ। বদিউদ্দিন সাহেব ছিলেন আলীগড়ের গ্রাজুয়েট এবং প্র্যাক্টিসিং মুসলমান। তিনি সোভিয়েত রাশিয়াতেও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। তাদের একজন গাইড ছিল রুশ তরুণী। বদিউদ্দিন সাহেব সেই তরুণীকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য? তরুণী জবাব দেয় হ্যাঁ। এবার বদিউদ্দিন সাহেব প্রশ্ন করেন, তুমি আল্লাহ মানো? তরুণী একটুও না চমকে উত্তর দেয়, হ্যাঁ। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য মানেই নাস্তিক বা নাস্তিক না হলেও পার্টির সভ্য হওয়া যাবে না, এটা সর্বাংশে সত্য নয়।

 

তথ্যসূত্র: সোভিয়েত দেশে মুসলিম জীবন; আবু জাফর শামসুদ্দিন, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬, পৃষ্ঠাঃ ১৫-১৬, ২৭-২৯, ৩০-৩২

3 comments

Your email address will not be published. Required fields are marked *