বই

এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্টমডার্নিজম চিন্তার অভিযাত্রা

আধুনিকতা বা মডার্নিজম যেমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি, তেমনি উত্তর-আধুনিকতাও একটি দৃষ্টিভঙ্গি। উত্তর-আধুনিকতা বা পোস্ট মডার্নিজম আধুনিকতার ধারণার অভিঘাতেই তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে জন্ম নিয়েছে। উত্তর-আধুনিকতাকে বোঝবার জন্য আমাদেরকে প্রথমেই  আধুনিকতাকে বুঝতে হবে। কেননা, এর মধ্য থেকেই উত্তর-আধুনিকতার যাত্রা শুরু হয়েছিল। আধুনিকতার জন্ম আবার পুঁজিবাদ বা ক্যাপিটালিজমের মনোগাঠনিক চিন্তা হিসেবে। এই আধুনিকতাকে বোঝা রীতিমতো অসম্ভব। পোস্ট মডার্নিস্ট চিন্তা ঠিক কীভাবে আধুনিকতার ক্রিটিক করে সেটা জানাও জরুরি।

এই বইতে খুব সহজ করে আধুনিকতা আর উত্তর-আধুনিকতাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি মূলত তরুণ পাঠকের জন্য। তারা বইটা পাঠ করে আনন্দ পেলেই আমার লেখা সার্থক হবে।

প্রকাশক: বাতিঘর
প্রকাশের সময়: September 11, 2020
Review by​: ফাহাম আবদুস সালাম

এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্ট মডার্নিজম পড়লাম। পিনাকী দা আমার খুব পছন্দের মানুষ। পছন্দের মানুষদের লেখা বই নিয়ে আলোচনা করা খুবই মুশকিল, রাইসু চাইলে এই সমস্যা নিয়ে একটা বইই লিখে ফেলতে পারবেন। তবু চেষ্টা করি সৎ থাকার।

পিনাকী যে বিষয় নিয়ে লিখছেন সে বিষয়গুলো নিজে আত্মস্থ করে পরে লিখেছেন। বাংলাদেশে যারা তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে লেখেন তাদের অনেকেই নিজেরা ব্যাপারগুলোর প্রয়োগ বোঝেন না। পিনাকী যতোটুকু বোঝেন, পরিষ্কার বোঝেন, লেখেন তার চাইতেও পরিষ্কার।

বইটি লিখেছেন তার ছেলেকে দর্শনের গতিপথ বোঝানোর উছিলায়, সানন্দার “আমার মা সব জানে” যেভাবে লেখা ঠিক সেভাবে।

আমি নিজে এই ধরনের বই লেখার পক্ষে নই। কেন?

এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্ট-মডার্নিজম হচ্ছে মোটামুটি ২০০ বছরের দার্শনিক গতিপথ। এই কাজটা ১০০ পৃষ্ঠায় করলে ভালগার হতে বাধ্য। এমন বহু জিনিস আছে যেটা আমি মনে করি লেখা প্রয়োজন ছিলো যেটা তিনি মনে করেন নি। যেমন পোস্ট-মডার্নিস্টদের যে কালচারাল এপ্রোপ্রিয়েশান – এর সাথে মার্ক্সিজমের হরিহর আত্মা সম্পর্ক নিয়ে তিনি কিছুই বলেন নি – যেটা আমার দৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমি যেহেতু অল্প মেধার মানুষ, যে কোনো জিনিস বিরক্তিকর ডিটেইলে না গেলে আমার মাথায় ঢোকে না। আমি কোনো বিষয়কে যেমন কামলার মতো এপ্রোচ করি, এ ধরনের বই ঠিক তার উল্টা। আমার ধারণা, এতে নুয়ানসেসগুলো নষ্ট হয়। আমি বিশ্বাস করি, জটিল বিষয়কে জটিল হিসেবেই বুঝতে হবে এবং মূল ভাষাতে বুঝতে হবে।

হ্যাভিং সেইড সো, পিনাকীর বইটা খুবই সুখপাঠ্য – তবে যারা এই বিষয়ে কিছুই জানেন না (যাদের জন্য বইটা লেখা), তারা বইটার লুফৎ নিতে পারবেন না বলেই আমার ধারণা। তিনি একটার সাথে আরেকটা বিষয়ের ছোট্ট যেসব যোগাযোগ – সেগুলো ধরিয়ে দেন। কাজটা সহজ না। পিনাকীর কাছে ব্যাপারটা অবলীলায় সম্পন্ন হয়। এই জিনিসটা যে ব্যাপারগুলো ভালোভাবে জানে তার কাজে আসবে, যে কিছুই জানে না – তাকে শুধু দেখনদার হতেই সাহায্য করবে।

আমাদের ডীন একটা কথা বলতেন, তোমার পিএইচডির কাজটা যদি তুমি তোমার মাকে দশ মিনিটে বোঝাতে পারো তাহলে বুঝবো তুমি নিজে ব্যাপারটা ঠিক মতো বোঝো।

পিনাকী যা লিখেছেন সেটা নিজে ভালো করে বোঝেন।

এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্ট মডার্নিজম মোটেও অবশ্যপাঠ্য না, তবে খুবই সুখপাঠ্য।

মূল লেখাটি দেখতে এখানে ক্লিক করুন।

Review by​: খুরশিদা খুশি

দর্শন কোনো বিজ্ঞান নয়, কোনো কলা বা আর্টও নয়। এককথায় বলতে গেলে “দর্শন মানুষের চিন্তার গণ্ডি বাড়ানোর নিরন্তর চেষ্টার নাম”।

সত্য জ্ঞান আমরা পাই আমাদের ইন্দ্রিয় যে সত্য দেয় সেখান থেকে।

সক্রেটিস বলেছেন – “নিজেকে জানো”।তারমানে তোমার আত্মাকে জানো। তাঁর কাছে সত্য জ্ঞান আছে। তোমার আত্মা অন্য ওয়ার্ল্ড থেকে পরমাত্মার কাছ থেকে সত্য জ্ঞান নিয়ে এসেছে।

কথাগুলো খুব কঠিন লাগছে তাইনা? আমার কাছেও প্রথম দিকে কঠিন লেগেছিলো তবে যখন ধাপ বাই ধাপ পড়ে গেলাম তখন মনে হচ্ছিলো লেখক আমার সামনে বসে শিক্ষকের মতো করে গল্পের ছলে একটু একটু করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন। দর্শন, যুক্তিবাদ, আধুনিকতা, এনলাইটেনমেন্ট, ফ্যাসিবাদ, পুঁজিবাদ,ক্যাপিটালিজম, বুর্জোয়া গণতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ,ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এমনকি সিমুলাক্রা সম্পর্কে সহজ সুন্দর ধারণা দেয়া আছে বইটাতে।এই প্রত্যেকটা বিষয়ই একটা অন্যটার সাথে সম্পর্কিত এই বইটা না পড়লে জানতামই না।

হ্যাঁ আমি এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্ট মডার্নিজম

চিন্তার অভিযাত্রা ” বইটার কথাই বলছি।যে বইটার লেখক-পিনাকী ভট্টাচার্য। ১০৫ পৃষ্ঠার এই বইটাতে তিনি দর্শন নিয়ে আলোচনা করেছে এবং খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছেন দর্শন মানে” শুধু দেখা নয়”।

লেখকের লেখার মূল্য কোনকালেই, কোনভাবেই, কোন সম্পদেও দেয়া সম্ভব নয় তবে কাগজগুলোর মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০০ টাকা।

এই বইটার একটা বৈশিষ্ট্য আছে, এটা প্রথমবার পড়ার পর মনে হবে অনেককিছু অজানা থেকে গেলো, মনের মধ্যে খুঁতখুঁত করবে, দ্বিতীয়বার পড়তে ইচ্ছে করবে তবে বিরক্ত লাগবে না।

Review by​: মো: ফজলুল হক।

আমাদের স্টাডি সার্কেল ‘ফেনী রিডার্স ফোরাম’ এর অক্টোবর মাসের পাঠ্য বই হচ্ছে ইয়স্তেন গার্ডারের ‘সোফির জগৎ’৷ সাড়ে পাঁচশত পৃষ্ঠার ডাউস আকৃতির বইটির থিম হচ্ছে ওয়েস্টার্ণ ফিলসফি৷ ফিলসফি পাঠ্য হিসেবে আসলেই একটি নিরস বিষয়, কিন্তু অবশ্য পাঠ্য বটে৷ আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি বড় বইটি পড়ার আগে ছোট দুটি বই পড়ে নেবো৷ তাহলে বড় বইটি বুঝতে সহজ হবে৷ সে বই দুটি হচ্ছে ডাক্তার পিনাকী ভট্টাচার্যের ‘এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্ট মডার্ণিজম’ এবং ‘ভারতীয় দর্শনের মজার পাঠ’৷

ছোট বই পড়তে বেশ আগ্রহ জাগে৷ তাই পোস্ট মডার্ণিজম দিয়েই শুরু করলাম৷ নিজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনার কারণে ওয়েস্টার্ণ ফিলসফি এবং ওরিয়েন্টাল ফিলসফির সাথে ভালোভাবেই পরিচিত ছিলাম পূর্ব হতেই৷ ফিলসফি আসলে ব্যাপক বিষয়৷ এটি এক বসায় পড়ে শেষ করে ফেলার মতো সে রকম কিছু না৷ ফিলসফিতে বিষয়ের ব্যাপকতা যেমন আছে তেমন আছে বিষয়ের গভীরতা, তেমন আছে বৈপরিত্যতা, তেমনি আছে দূর্বোধ্যতা৷ সে জন্য আমরা পড়তে গিয়ে যেমনি বিরক্তি নিয়ে পড়েছি তেমনি আজকাল পড়াতে গিয়েও দেখছি আমাদের ছাত্র ছাত্রীরাও বিরক্তি নিয়েই পড়ছে৷

ফিলসফির মতো এমন নিরস বিষয়টিকে সহজ সাবলীল ভাবে গল্প উপন্যাসের মতো করে উপস্থান করতে কম মানুষই পারে৷ সহজ করা আসলেই সহজ কাজ নয়৷ আমাদের দেশে এমনিতে বইয়ের পাঠক কম৷ তার উপর অধিকাংশ পাঠক গল্প উপন্যাস নিয়েই থাকেন৷ অথচ একজন পাঠক এ সকল ফিকশন পাঠ করতে করতে ননফিকশনের দিকে নিজের পাঠাভ্যাসকে নিয়ে যেতে না পারলে তিনি আসলে প্রকৃত পাঠক হয়েই উঠেন না৷ তিনি জ্ঞানের মূল শাখাটির সন্ধান পান না৷ এটি এক ধরনের পাঠ বৈকল্য বলা যায়৷ এর উত্তরণে লেখকগণ এগিয়ে আসতে পারেন৷ বিশেষ করে ননফিকশন বইসমূহকে ফিকশনের ধাঁচে লিখতে পারলে পাঠকগণ বেশি উপকৃত হবেন৷ যদিও সব বই সে ভাবে লেখা সম্ভব নয়৷ তবে কিছু কিছুতো সম্ভব৷ সে ধরণের অসাধারণ একটি কাজই করেছেন ডাক্তার পিনাকী ভট্টাচার্য৷ পোস্ট মডার্নিজম বইটিতে লেখক পিতা পুত্রের গল্পের মধ্য দিয়ে কঠিনসব বিষয়কে কততো সহজে তুলে ধরেছেন৷ এটি পড়ে যে কারো ভালো লাগবে৷ তবে বইটি অবশ্য ফিলসফির একেবারে প্রাথমিক পাঠকদের জন্য লিখিত৷ তিনি সে কথাটি বইয়ের ভুমিকাতেই বলেছেন৷ কেউ যদি ফিলসফি সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে চায় তবে তার জন্য এ বই না৷ আমি ব্যক্তিগতভাবে বেশ উপভোগ করেছি বইটি৷ এ রকম আরেকটি বইয়ের কথা বলতে পারি, এস এম জাকির হুসাইন এর ‘অন্ধকারের বস্ত্রহরণ’৷ সে বইটিতেও দর্শনের জটিল অনেক বিষয়কে উপন্যাসের আদলে খুব সুখপাঠ্য করে তুলে ধরা হয়েছে৷

‘পোস্ট মডার্ণিজম’ বইয়ে লেখক গল্পে গল্পে তুলে ধরেছেন ফিলসফি বা দর্শন এর সংজ্ঞা, অভিজ্ঞতাবাদ, যুক্তিবাদ, আধুনিকতা, উত্তর আধুনিকতা, এনলাইটেনমেন্ট, এপিস্টোমিওলজি, ফ্যাসিবাদ, পুঁজিবাদ, গণতন্ত্র, বুর্জোয়া, ধর্ম, নৈতিকতা, সামন্তবাদ, সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র, প্রলেতারিয়েত, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ, সিমুক্রালাসহ আরো অনেক বিষয়৷ এসব বিষয় বুঝাতে গিয়ে লেখক কত যে দার্শনিকদের বক্তব্য আর বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেছেন তার হিসাব করা কঠিন৷ সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, ম্যাকিয়াভেলী, ফুকো, লক, হিউম, বার্কল, ফ্রয়েড, হেগেল, মার্কস, এঙ্গেলস, লেলিন, ম্যাক্স ওয়েবার, জন কেলভিন, অ্যাডাম স্মিথ, চার্লস ডিকেন্স, রুশো, ড্রেফুস, হিটলার, মুসোলিনি কেউ বাদ যায়নি৷ প্রসঙ্গক্রমে এসেছে সলীমুল্লাহ খাঁনের বক্তব্য৷ উপমা হিসেবে লেখক তুলে ধরেছেন কবি শার্ল বোঁদলেয়ার, কবিগুরু রবি ঠাকুর, কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং হাল আমলের কবি কামরুজ্জামান কামুর কবিতা৷

এ বইয়ে স্মরণীয় অনেক কথা থাকলেও সবগুলো উল্লেখ করছি না৷ শুরুর দিকে লেখক বলেছেন, মানুষের চিন্তার গণ্ডি বাড়ানোর চিরন্তর চেষ্টার নাম দর্শন৷ দর্শন প্রমাণের কোন বিষয় নয়, দর্শন শুধু দেখতে ও জানতে শেখায়৷ দর্শন বিজ্ঞান বা আর্টসও না, বরং এ দুটির মাঝামাঝি৷ আমরা সাধারণ চোখ দিয়ে যা দেখি তার অতিরিক্ত কিছু দেখার চেষ্টা ও চিন্তা করাই হচ্ছে ফিলসফি৷ এই চিন্তার মাঝে দার্শনিকদের মধ্যে থাকতে পারে মত বৈপরিত্য৷ একমত হওয়ার চাইতে বহুমত হওয়াটাই স্বাভাবিক৷ কে সঠিক সেটি ফিলসফিতে বিবেচ্য বিষয় না৷ দর্শনের কর্তব্য সত্য নির্ণয় নয়, বরং নানান ভাষা ও বক্তব্যে চিন্তার ক্রমাগত পর্যালোচনা দর্শনের কাজ৷

লেখক বলেছেন দর্শনে জ্ঞানতত্ত্বের দুটি ধারা গড়ে উঠেছে৷ একটা হচ্ছে অভিজ্ঞতাবাদ, অন্যটি হচ্ছে যুক্তিবাদ৷ আমাদের অঞ্চলের দর্শনতত্ত্বে জানাটা মূখ্য ছিলো না৷ মূখ্য ছিলো কীভাবে মানুষ মুক্তি পেতে পারে তার চিন্তা৷ কখনো কখনো জানার আকাঙ্খাটা ক্ষমতার আকাঙ্খা হয়৷

বইয়ের মধ্যভাগে লেখক আধুনিকতার সাথে যুক্তিবাদ, প্রগতি, ফ্যাসিবাদ, পুঁজিবাদ ইত্যাদির সম্পর্ক তুলে ধরেছেন৷ লেখক বলেছেন, আধুনিকতার জন্ম পুঁজিবাদের মনোগাঠনিক চিন্তা হিসেবে৷

বইয়ের শেষের দিকে এসে লেখক বলেছেন, মার্ডানিজম শেষ হওয়ার পর পোস্ট মডার্ণিজম শুরু হয়েছে বিষয়টা এমন না৷ বরং মডার্ণিজম ও পোস্ট মডার্ণিজম পাশাপাশি বিরাজ করছে, একসাথেই চলছে৷ আধুনিকতার মতোই উত্তর আধুনিকতাও একটি দৃষ্টিভঙ্গি৷ আধুনিকতার ধারণার অভিঘাতেই তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে এটির জন্ম৷ পার্থক্যটা হচ্ছে, মডার্ণিজম মেটা-ন্যারেটিভ তৈরি করে, আর পোস্ট মডার্ণিজম ম্যাটা-ন্যারেটিভকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করে, সমালোচনা বা পর্যালোচনা করার প্রয়াস পায়৷ এখানে ‘ম্যাটা-ন্যারেটিভ’ শব্দটি দ্বারা আমি বুঝেছি কোন কিছুর আকাঙ্খা৷

বইটির কাগজের সাইজ প্রমাণ সাইজের চাইতেও ছোট৷ পৃষ্ঠা সংখ্যা ১০৩৷ লেখার ফন্ট সাইজও বড়৷ মাঝে মাঝে চিত্র আছে৷ যদি প্রমাণ সাইজের ফন্টে এবং প্রমাণ সাইজের পৃষ্ঠায় এটি ছাপানো হতো তবে পৃষ্ঠা সংখ্যা অনেক কম হতো৷ এমন ছোট আকৃতির ১০৩ পৃষ্ঠার এ বইয়ে মূল্যটা দুইশত টাকা রাখাটা অনেক বেশি মনে হয়েছে আমার নিকট৷ ছাপার মান ও বাঁধাই, প্রচ্ছদ ইত্যাদি অসাধারণ হয়েছে৷ বইটি প্রকাশ করেছে বাতিঘর প্রকাশনী৷ আমি এ বইটি এক বসায় শেষ করেছি৷ সম্ভবত ঘন্টাখানেক লেগেছে বইটি শেষ করতে৷ যারা আগ্রহী বইটি পড়ে নিতে পারেন৷

#হ্যাপি_রিডিং

Review by​: রোমেনা আফরোজ

অনেকদিন থেকেই মনের ভেতর এনলাইটেনমেন্ট নিয়ে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। এই আগ্রহের হেতু পড়ে ফেললাম, সলিমুল্লাহ খানের “মিশেল ফুকোর বাতি জ্বালানি”। তখন আরও কয়েকটি লেখা গোগ্রাসে গিলেছিলাম৷ পিনাকি ভট্টাচার্যের “এনলাইটেনমেন্ট কী” শিরোনামের একটি লেখাও তাতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ঠিক সেই সময়ে “এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্টমডার্নিজম” বইয়ের প্রচ্ছদ শেয়ার করলেন পিনাকী দা। তখন থেকেই দিন গুনছিলাম। এজন্য বাতিঘরে কয়েকবার ফোনও করেছি। আমার অতীব আগ্রহের কারণ লেখকের, “মন ভ্রমরের কাজল পাখায়” বইটি খুব টেনেছিল। “সোনার বাংলার রূপালি কথা” পড়ার সময় থেকে একটি বৈশিষ্ট্য খুব আকর্ষণ করছে, তা হলো, গল্পচ্ছলে যে কোন বিষয়কে সহজভাবে উপস্থাপন করা। সেই কারণেই বইটি হাতে পাওয়া মাত্র পড়তে শুরু করলাম।

“মানুষের চিন্তার গণ্ডি বাড়ানোর নিরন্তর চেষ্টার নাম দর্শন”। এরচেয়ে সহজ ভাষায় দর্শনকে কখনো উপস্থাপিত হতে দেখিনি। ছোটবেলা থেকে ফিলোসোফির কিছু দেখলেই জ্বর আসতো। অথচ এই বক্তব্য আমার চিন্তার জগতকে আলোড়িত করলো। ভাবলাম, আরে তাই তো, এটাই তো দর্শন। কিন্তু এমন সহজভাবে কেউ তো উচ্চারণ করেনি। আধুনিকতাকে যেভাবে লেখকরা তুলে ধরেন, তাতে সবসময় পিছিয়ে থাকতাম। শুধু আধুনিকতা কিংবা দর্শন নয় ফ্যাসিবাদ, পোস্ট মডার্নিজম,পুঁজিবাদ প্রতিটি বিষয়কে সাধারণের বোধগম্যতার পর্যায়ে নিয়ে গেছে এই বইটি।

দীর্ঘদিন ধরে ক্যাপিটালিজম নিয়ে পড়ছিলাম। অরুন্ধতী রায়ের একটি বই পড়ে এ বিষয়ে আগ্রহ জেগেছিলো। পুঁজিবাদ নিয়ে যতই পড়েছি ততই একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিলো। অথচ তিনি লিখলেন, “ক্যাপিটালিজমের কালপর্বেই প্রথম পৃথিবী থেকে ব্যাপকভাবে দারিদ্র্য দূর শুরু হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য দূর হয়েছে ১৯৭৯ সালে চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর থেকে। এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশসহ পৃথিবীর যে সমস্ত অঞ্চলে চরম দারিদ্র্য বিরাজ করছে, যেমন –ভারত ও সাব সাহারান আফ্রিকার কিছু গ্রামীণ অঞ্চল, সেখানে এখনো পর্যন্ত ক্যাপিটালিজম পৌঁছেনি” বইয়ের এ লেখাটুকু আমাকে ভাবনায় ফেলে দিয়েছিল। কারণ ক্যাপিটালিজম যে দারিদ্র্য দূর করতে পারে তা কখনো শুনিনি। সে চিন্তার বীজ মাথায় নিয়েই বই পড়ছিলাম। ঠিক এক প্যারা পরে লেখক যে যুক্তি দিলেন তাতে বিষয়টা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো, ” তবে শুধু ক্যাপিটালিজম দিয়েই পৃথিবীর বাকী দারিদ্র্য দূর করা যাবে না। এর সঙ্গে আরো কিছু রাজনৈতিক,সামাজিক আর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যা সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে, সার্বজনীন স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা করবে, আর সর্বোপরি এমন কিছু চেক অ্যান্ড ব্যালান্স সৃষ্টি করবে যাতে সম্পদ অল্প কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক অসাম্য তৈরি না করে”…এই প্রথম পুঁজিবাদকে একটু ভিন্নভাবে দেখতে বাধ্য হলাম।

“এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্টমডার্নিজম বইটিতে জটিল বিষয়কে খুব সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অনেক বইয়ের দুর্বোধ্যতার ধরনে বুঝতে পারি, কেন সাধারণ মানুষ বই থেকে দূরে ক্রমশ সরে যাচ্ছে। আমি বুঝি না, এত জটিলভাবে লেখার কী অর্থ থাকতে পারে! যাহোক,এই বইটি পড়তে যেয়ে অসংখ্যবার মনে হলো, এমন লেখার পর নিশ্চয় লেখক আর পাঠকের ব্যবধান কমবে।

Review by​: কামরুজ্জামান কামু

Pinaki Bhattacharya’র নতুন বই ‘এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্ট মডার্নিজমঃ চিন্তার অভিযাত্রা’ বাংলা ভাষা পড়তে পারা চিন্তাশীল নবীন তরুণ প্রজন্মের সামনে একটা প্রয়োজনীয় বই হিসাবে আবির্ভুত হয়েছে। কী সেই প্রয়োজন? প্রয়োজন হইল, এই বই পড়ার মধ্য দিয়ে খুব সহজেই ব্যক্তি হিসাবে সেই নবীন তাঁর অবস্থানকে চিহ্নিত করতে পারবেন। আধুনিকতার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রশ্ন করতে করতে যে উত্তরাধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ব’লে এক নতুন বয়ান হাজির হইতেছে মানবেতিহাসে, তাকে বৈঠকি ঢঙে পিতাপুত্রের আলাপের ছলে নবীন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার ইচ্ছাটাই একটা বড় প্রশংসার দাবী রাখে। এমনকি বড়রাও এই বইটা সহজ আনন্দে পড়ে ফেলে দিলে আধুনিকতা, উত্তর-আধুনিকতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদ, বুর্জোয়া গণতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ, পুঁজিবাদ, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের নানান দার্শনিক প্রপঞ্চ সম্পর্কে ধারণাগুলি আরেকবার স্মরণ করার সুযোগ পাবেন। আমি পড়া শেষ করে মেয়েকে পড়তে দিলাম। আশা করি এই বইয়ের সূত্র ধ’রে সে আরও অনেক বিষয়জ্ঞান অর্জনে অনুপ্রাণিত হবে। বইয়ের প্রকাশক বাতিঘর। যে কেউ ঘরে বসেই rokomari.com থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন।

Review by​: মনোয়ার মোস্তফা

বইটি আমি খুব আগ্রহ নিয়ে পড়েছি। বেশ কয়েক বার পড়েছি। এক কথায় বলবো: বইটা ‘ভেরি ইন্টারেস্টিং‘। এটা আপনার চিন্তাকে দারুণভাবে নাড়া দেবে। এখানে যে সব ‘চিন্তা’র সমাবেশ ঘটানো হয়েছে, এটা ভাবার কোন কারণ নেই যে, সেগুলি পিনাকী ভট্টাচার্যের মৌলিক চিন্তা। এ দাবি তিনি করেনও নি। বিগত কয়েক’শ বছর ধরে সভ্যতার হাত ধরে যে সব ‘চিন্তা’ উঠে এসেছে, বিশেষ করে পশ্চিমে, লেখক সেগুলিকে নিয়ে সুন্দর একটা ‘মালা’ গাঁথবার চেষ্টা করেছেন মাত্র। এই চেষ্টায় তিনি বেশ সফল- এমনটাই মনে হয়েছে।

তবে আমার ধারণা, বইটা লেখার ভেতর দিয়ে তিনি কয়েকটা এক্সপ্রিমেন্ট চালানোর চেষ্টা করেছেন। সুতরাং এই বই নিয়ে যখন আমি সামান্য কয়েকটা কথা বলবো, তখন মূলত: তিনটা দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখার চেষ্টা করবো। এক: এই বইটা কি কায়দায় লিখা হয়েছে, তার মানে বইটা লেখার ‘ফর্ম’। দুই: এর বিষয়বস্তু কি, মানে কনটেন্ট কি? এর ভেতরে কি আছে? এবং তিন: বইটা আসলে আমাদের কি কাজে লাগবে?

শুরু করি বইটা লেখার ধরণ বা ফর্ম  নিয়ে। ধরণটা খুবই ইন্টারেস্টিং! এই ধরণটা যে একেবারেই নতুন তা না। আমাদের দেশেও এ কায়দায় অনেক বই লেখা হয়েছে। বিশেষ করে সে সব বিষয় নিয়েই এই ফর্মটা কাজ করে, যেটা খুব গুরু-গম্ভীর জটিল। এসব বিষয় নিয়ে সাধারণত: ‘পন্ডিতি কায়দায়’ যা লেখা হয়, তা সাধারণের বোধগম্য হয় না। আর বিশেষ করে করে তা যদি হয় দর্শন সংক্রান্ত, তাহলে সেটা আরও জটিল আকার ধারণ করে। কারণ, আপনারা দেখেছেন যে দর্শনের বেশির ভাগ বইগুলো যা বিজ্ঞজনরা লেখেন, তা খুবই জটিল ও র্দুবোধ্য ভাষায় লিখিত। এটা পিনাকী ভট্টাচার্যের এক্সপ্রিমেন্ট যে, উনি এ দূর্বোধ্য জিনিসকে সহজ করে সাধারণ মানুষের সামনে হাজির করার চেষ্টা করেছেন; এটা তার ‘এক্সিপ্রিমেন্ট’। এই ‘এক্সপ্রিমেন্ট’ যে তিনি নতুন করছেন, এমনটা নয়। আমি লেখকের আগের বইগুলোও পড়েছি। বিশেষ করে ‘সোনার বাংলার রূপালী কথা’ নামে যে বইটা আছে, যা মূলত: আমাদের বাঙ্গালীর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের পাঠ; সেখানেও এই ফর্মটা ছিল। তিনি তাঁর পুত্রের সাথে কথা বলছেন। পুত্রকে বুঝাচ্ছেন ইতিহাস কি? পিতা-পূত্র ইতিহাসের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, আর কথা বলছেন৷ এই ফর্মে হয়তো ইতিহাস বুঝানো যায়। কিন্তু দর্শন?

আমি খুব চমকে গিয়েছি যখন পূত্রকে দর্শন বুঝাচ্ছেন, দর্শনের ইতিহাসের ওপর দিয়ে হাঁটছেন দু‘জনে। এটা একটা দারুন ফর্ম। এই ফর্মটা আমরা পেয়েছিলাম অন্য একটা জায়গায়। একশত বছরেরও বেশি আগে বঙ্কিমচন্দ্র যখন ধর্মত্বত্ত লিখছিলেন, ধর্মত্বত্তের মতো জটিল দার্শনিক বিষয়গুলো বঙ্কিমও ঠিক এই ফর্মে লিখেছিলেন৷ তিনি গুরু-শিষ্যের সংলাপের ভেতর দিয়ে ধর্মত্বত্তের আলোচনা করেছিলেন। সেটাও ছিল খুবই কার্যকর। ধর্মত্বত্তের মতো এরকম জটিল ও দার্শনিক বিষয়াবলী সহজবোধ্য করে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে।

আজকের সময় ও প্রেক্ষিতটা ভিন্ন। পিনাকী ভট্টাচার্য হয়তো একই এক্সপ্রিমেন্টটাই করার চেষ্টা করলেন। ফর্মটা সব সময়ই খুব গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ করে জটিল-কঠিন বিষয়গুলোকে সহজবোধ্য করার জন্য এ ধরনের ডায়ালগ ফর্ম এর অপরিসীম গুরুত্ব আছে। আমরা জানি প্লেটো, সক্রেটিস প্রমূখেরা এই ডায়ালগ ফর্মটাকেই জ্ঞান চর্চার একটা অন্যতম ধারা হিসেবে নিয়েছিলেন। এবং পিনাকী ভট্টাচার্যের এই দর্শন বিষয়ক বইটার ভেতরে সে ফর্মটা আবিষ্কার করে, আমার আসলে খুবই ভালো লাগলো।

দ্বিতীয় যে জায়গাটা সেটা হলো ‘বিষয়বস্তু‘। এই বইয়ের ভেতরে কি আছে? আমি আগেই বলছি বইটার নাম ‘এনলাইটেনমেন্ট থেকে পোস্টমর্ডানিজম: চিন্তার অভিযাত্রা’। তার মানে বুঝাই যাচ্ছে, এখানে এমন কতোগুলো গুরুগম্ভীর বিষয় এসে হাজির হয়েছে যেটা হয়তো সাধারণের বোধগম্য না। যা অন্তত: আমাদের বিদ্যমান যে লিটারেচার আছে, তা পড়ে বুঝা খুব শক্ত। কিন্তু তিনি এই শক্ত জিনিসটাকেই তিনি ‘তরল‘ বা সহজ করার চেষ্টা করছেন।

তিনি শুরুই করেছেন দর্শন কী জিনিস- এই প্রশ্ন দিয়ে।

বইটার মূল বিষয়বস্তু ‘উত্তর আধুনিকতাবাদ বা পোস্টমডার্নিজম’। কিন্তু বইয়ের ৭৫ ভাগই দেখবেন, পোস্টমডার্নিজম নিয়ে আলোচনা নয়। বরং পোস্টমডার্নিজমকে বুঝার জন্য অন্যান্য যে উপাদানগুলোর সাথে পরিচিত হওয়া দরকার তার সঙ্গে তিনি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন পূত্রকে।  মাত্র ২৫ ভাগ অংশে তিনি উত্তর আধুনিকতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

মজার ব্যাপার হলো, ঐ ৭৫ ভাগ না জানলে পোস্ট মডার্নিজমে আসা যাবে না। এই সত্যটা উনার জানা ছিল বলেই, তিনি ঠিক এই ফর্মটাই বেছে নিলেন। তিনি পূত্রকে নিয়ে গেলেন, দর্শন কী সেটা বুঝাতে। সেই দর্শনের সূত্র ধরে চলে এলেন ‘আধুনিকতা’ কী, সেটা বলতে। ‘আধুনিকতা‘ বুঝতে গেলে যে জিনিসটা দরকার সেটা হচ্ছে ‘এনলাইটেনমেন্ট‘, সেটা জানা। কেউ কেউ এটাকে বলে ‘আলোকায়ন‘। পিনাকী ভট্ট্রাচার্য বলেছেন ‘জ্যোতির্ময় কাল‘। একটা নতুন শব্দ আমারা পেলাম। তিনি এ সময়কালটা যেমন বুঝিয়েছেন, ঠিক তেমনি এই ‘এনলাইটেনমেন্ট’ বা জ্যোতির্ময় কাল বলতে ঠিক কী বুঝায়, এর মূল মূল উপাদানগুলো কি, তার ব্যাখ্যা করলেন। এই এনলাইটেনমেন্ট এর ভেতর দিয়ে যে পশ্চিমা সভ্যতার বিকাশ ঘটলো- সেটাও দেখালেন। একই সাথে সেই সভ্যতার ভেতরে কীভাবে ফ্যাসিবাদের জন্ম হলো, সেই সূত্রটা তিনি ধরিয়ে দিলেন। এবং সেটা বলতে গিয়ে বললেন, এই ফ্যাসিবাদের বীজ হয়তো ঐ ‘জ্যোতির্ময়কাল‘র মধ্যেই নিহিত ছিলো।

এর পরে ফ্যাসিবাদকে আরও গভীরভাবে বুঝতে চেষ্টা করলেন। তিনি পুত্রকে টেনে নিয়ে গেলেন ‘পুঁজিবাদ‘ কি, সেটা বলতে। পুঁজিবাদ সংক্রান্ত আলোচনা করতে গিয়ে গিয়ে নতুন আরো কিছু শব্দ-ধারণার মুখোমুখি হলো পূত্র। সেটা ‘বুর্জোয়া’। এই ‘বুর্জোয়া‘ বুঝাতে বুঝাতে আলোচনায় এসে হাজির হলো- ‘বুর্জোয়া গণতন্ত্র’ কী জিনিস? তিনি পুত্রকে সেটাও বুঝালেন৷ তারপরে তিনি বললেন- বুর্জোয়া গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ বা এনলাইটেনমেন্ট- এগুলোকে আরও গভীরভাবে অনুধাবন করতে গেলে আরেকটা নতুন শব্দের সাথে পরিচিত হতে হবে৷ নতুন একটা ধারণার সাথে পরিচিত হতে হবে, যার নাম ‘ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদ’, আমরা যাকে বলি individualism। এই আলোচনাটাও তিনি করলেন৷

সবকিছু করার পর তিনি গোটা আধুনিকতার পিলারগুলোকে একটার পর একটা সাজালেন৷ এখান থেকে তিনি যে সিদ্ধান্তটা টানলেন, সেটা হলো আধুনিকতায় মানুষের চিন্তার একটা ‘প্যাটার্ন‘ তৈরি হয়৷ কীভাবে চিন্তা করতে হবে, কোনটা সঠিক, কোনটা বেঠিক, কোনটা আগে করা দরকার, কোনটা পরে করা দরকার- এই যে একটা ‘অডার্লী অ্যারেঞ্জমেন্ট‘, এটা পোস্ট মডার্ন চিন্তায় নাই। কেন নাই? কারণ, পৃথিবীটা আসলে ঐভাবে তৈরী না, পৃথিবীতে অনেক ধরনের ‘এনোমাইলিজ’ আছে, যেগুলো আমরা ঠিক মেলাতে পারি না। কিন্তু আধুনিকতা জোর করে সেটা মেলাবার চেষ্টা করে। সুতরাং ওর ভেতরে বোধ হয় কিছু কৃত্রিমতা আছে৷

এই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি দার্শনিক দেরিদা‘কে নিয়ে এলেন, তার ‘দি কন্সট্রাকশান‘র ধারণাকে নিয়ে। এর আগেই মার্কসকে সামনে নিয়ে এসেছিলেন। এরকম বহু দার্শনিকদের আলোচনা করেই তিনি এই জায়গায় চলে এলেন যে, পোস্ট মডার্ণ ধারণাটার উদ্ভবই হয়েছে মূলত: আধুনিকতার যে Fundamental যে পিলারগুলো, যার উপরে সে দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলোকে প্রশ্ন করার ভেতর দিয়ে।

এভাবে পিনাকী ভট্টাচার্য তার পূত্রকে টেনে নিয়ে গেলেন ‘পোস্ট মডার্ণ’ আলোচনার মধ্যে। তিনি সেখানে নানা উদাহরণ ও দার্শনিকদের বক্তব্য ধরে দেখালেন যে, খোদ আধুনিকতার ভেতরে থেকেই কীভাবে আধুনিকতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছিল। তিনি কার্ল মার্ক্সকে সামনে নিয়ে এলেন। বললেন, মার্ক্স কীভাবে আধুনিকতার গর্ভে জন্ম নেওয়ার পরও সেই আধুনিকতাকেই প্রশ্ন করতে শুরু করলেন৷ এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক।

এরপরেই তিনি পোস্ট মডার্নিজমের Fundamental কতগুলো জায়গা আলোচনা করলেন৷ মূলত: সেই আলোচনায় ‘দেরিদা’ একটা বড় জায়গা নিয়ে আছেন। উনি হয়তো মনে করেছেন, পোস্ট মডার্নিজমকে বুঝতে হলে দেরিদা ভালো উদাহরণ।  অন্যান্য আরও অনেকেই অবশ্য আছেন। তবে দেরিদা‘ই এখানে মূখ্য। অন্যদের আলোচনা থাকলে আরো ভালো হতো।

এ পর্যায়ে আমার মন্তব্য হলো: এখানে অনেকে ভুল বুঝতে পারেন, কিন্তু মনে রাখতে হবে ধারণা বা বিশ্লেষণী ক্যাটেগরি বা ডিসকোর্স হিসেবে ‘মডার্নিজম‘এককভাবে কোন দার্শনিকের প্রস্তাবনা নয়। এ কথা অবশ্য লেখক বিভিন্নভাবে বলেছেন। ‘আধুনিকতা’ যখন তৈরী হয়েছে, সেটা কোন একক ব্যক্তির লেখা নয়, বহুজনের একটা সময় ধরে লেখালেখি বা চিন্তার ফল হিসেবে আধুনিকতা হাজির হয়েছে। এবং তার ‘কমন ট্রেইট‘গুলো কি, কমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো কী, সেগুলো তিনি ঐ ৭৫ ভাগ অংশে বিবৃত করার চেষ্টা করেছেন। উত্তর আধুনিক পার্টে এসে যখন আলোচনা করছেন, তখনও অনেকের মনে হবে যে, এটা কি কেউ একজন বলেছেন যে, এগুলোই হচ্ছে ‘উত্তর আধুনিকতা’? না, তাও না। উত্তর আধুনিকতা নিয়ে যারা কাজ করেছেন, যারা লেখালেখি করেছেন, চিন্তা করেছেন, সেটাও কোন একক ব্যক্তির জায়গা থেকে আসেনি, একাধিক ব্যক্তির লেখনির ভেতর দিয়ে সেগুলো হাজির হয়েছে। এবং সেখান থেকে কতগুলো ‘কমন ট্রেইট’ বা কমন বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন তিনি। এটা হচ্ছে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা এই বইটা পড়ার সময় আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে।

এখান থেকে তিনি একটা Fundamental প্রশ্ন তুলেছেন পুত্রের জবানিতে। প্রশ্নটা হল- তাহলে কি আধুনিকতা শেষ হয়ে গেছে? আমাদের পোস্ট মডার্ণ যুগ শুরু হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে পিনাকী ভট্টাচার্যের বক্তব্যটা খুব স্পষ্ট। যার সাথে সবাই হয়তো একমত হবেন না। তিনি বলছেন, একটা চিন্তা শেষ হওয়ার পরে আরেকটা চিন্তা শুরু হয় – ব্যাপারটা এরকম নয়। খোদ আধুনিকতার ভেতরে ‘উত্তর আধুনিক’ চিন্তার বীজ তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে মানুষ প্রশ্ন করতে শিখেছে। তিনি কার্লমার্ক্সকে বার বার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। খোদ পশ্চিমা চিন্তা কাঠামো বা আধুনিকতার ভেতরে জন্ম নেওয়ার পরও তিনি (মার্কস) আধুনিকতার fundamental কতগুলো বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে প্রথম খড়ক হাতে নেমেছিলেন।

বইয়ের ‘মোস্ট ইন্টারেস্টিং’ একটা অংশটা সবার শেষে। এর আগে শুধু এটুকু বলেছি যে, বইটা শুরু হয়েছিল তার পূত্রের সাথে কথোপকথন-এর ভেতর দিয়ে। সন্তান ছোট। এখনো কম্পিউটারে ‘গেম‘ খেলে। পূত্রের উপর্যপুরি অনুরোধে ‘প্লে-স্টেশন‘ কিনে দেওয়া হয়েছিলো তাকে। পিনাকী ভট্টাচার্যের প্রথমে মনে হয়েছিলো, এই ‘প্লে-স্টেশন’ একটা ফালতু জিনিস। পুত্রের সাথে কয়েকদিন খেলেছেন, বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে একদিন তিনি অফিস থেকে সন্তানকে ফোন করে বললেন, ‘বাবা তুমি এটা খেল, আমার কোন আপত্তি নেই’।

ছেলে চমকে যায়। বাবার ভেতরে হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন? যে বাবা কয়েকদিন আগেও এই ‘প্লে-স্টেশন‘ খেলা নিয়ে বকাঝকা করতো, সে বাবা আজ কেন ফোন করে বলছে, প্লে-স্টেশন তুমি খেলতে পারো! সন্তানের এই জিজ্ঞাসা নিয়েই এই বইয়ের কাহিনী শুরু হয়েছিল।

বইয়ের শেষাংশে এসে সন্তানের মুখ দিয়ে আসলে পিনাকী ভট্টাচার্যই প্রশ্ন তুলছেন, ‘বাবা তাহলে এই প্লে-স্টেশন এর সাথে কি পোস্ট মডার্নিজম কোন সম্পর্ক আছে?’ ‘হ্যাঁ, আছে’। পোস্ট মর্ডানিজমকে বুঝতে হলে এটা একটা দারুন উদাহরণ। বইয়ের এই শেষাংশটা দারুন মজার !

সব মিলিয়ে বইয়ের স্বার্থকতা এটাই যে, চিন্তার অভিযাত্রার সাথে অভিযাত্রী হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে সন্তানতে, যে সময়ের সাথে সাথে অগ্রসর হবে। চিন্তার অভিযাত্রা মানে মানব প্রজাতির অভিযাত্রা- এ এক দীর্ঘ যাত্রা।

এবার আসি আমার তিন নাম্বার পয়েন্ট-এ।

এই বইটা খুবই কাজের, এই অর্থে যে, প্রতিদিন আমাদের চারপাশে যা কিছু ঘটছে, যা কিছু নিয়ে আমরা বসবাস করছি সেগুলো আমাদের চিন্তার ভেতরে এক ধরনের আলোড়ন তৈরি করছে, অভিঘাত তৈরি করছে৷ এগুলোকে গভীরভাবে অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করার জন্য আমাদের হাতে কিছু ইন্সট্রুমেন্ট থাকা দরকার। একটা জগত থেকে আমরা আরেকটা জগতে চলে যাচ্ছি প্রতিদিন। এটা যেতেই হবে, এটাই হচ্ছে চিন্তার অভিযাত্রা। তো, চিন্তার সেই নতুন জগতে যাওয়ার জন্য এই বইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে৷

একটা রূপক আকারে যদি বলি, এই বইটা হচ্ছে একটা চমৎকার ‘ব্রীজ‘। দু‘টো বনের ভেতরে, দু‘টো জঙ্গলের সাথে সংযোগ তৈরী করার জন্য একটা চমৎকার ব্রীজ, যার উপর দিয়ে আপনি স্বাচ্ছন্দে হেঁটে যাবেন। একটা নতুন জগতে প্রবেশ করবেন। সেখানে গিয়ে হয়তো আরও নতুন নতুন ‘জিনিস’ আপনাকে জানতে হবে। পোস্ট মডার্নিজম নিয়ে ‘সাধারণ‘ যা জেনে গেলেন, সেই নতুন জগত নিয়ে আপনাকে আরও ‘বিশেষ’ কিছু জানতে হবে৷ কিন্তু যেতে হলে আপনি বহু পথ ঘুরে যেতে পারতেন। হয়তো কোন এক সময় পথ আপনি হারিয়েও যেতে পারেন।

কিন্তু এই বইটার সুবিধা হলো, এই বইয়ের ভেতর দিয়ে লেখক এমন একটা ব্রীজ রচনা করেছেন, সেই ব্রীজ-এর ওপর দিয়ে আপনি হেঁটে সহজে চলে যেতে পরবেন এবং খুব দ্রুত যেতে পারবেন। যদি চিন্তার নতুন জগতে নাও যেতে চান, তাতেও কোন অসুবিধা নেই। এই ব্রীজের ওপরে দাড়িয়ে হাওয়া খেলেও লাভ ! কারণ আপনি দাড়িয়ে আছেন চিন্তার দু‘জগতের মাঝখানে। দু’জগত থেকেই আপনি হাওয়া পাবেন- এপাশ থেকেও কিছু জানবেন ওপাশ থেকেও কিছু ধরবেন !! একারণেই বইটাকে আমার কাছে একটা well constructed bridge মনে হয়েছে।

দর্শন এবং বিশেষ করে দর্শনের ইতিহাস চর্চায় যাদের সামান্যতম আগ্রহ আছে, আমার মনে হয় এই বইটা তাদের সকলের পড়া উচিত। বিশেষ করে তরুন প্রজন্মকে বইটা পড়ার আহবান জানাই। আমি নিশ্চিত এটা আপনার চিন্তায় নাড়া ফেলবে। এই ‘নাড়া ফেলা’র ভেতর দিয়েই নতুন চিন্তার উন্মেষ ঘটবে, চিন্তার অভিযাত্রায় আরো নতুন জিনিস যুক্ত হবে। সেটা হবে এই বইকে অতিক্রম করে যাওয়া। চিন্তার অভিযাত্রায় নতুন অভিযাত্রী হিসেবে আপনিও আবির্ভূত হবেন। আমার আশাবাদ এতোটুকু মাত্র।

অনুলিখন: সাদিয়া আহমদ (আনিকা)
অনার্স তৃতীয় বর্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Subscribe to
Newsletter