বই

মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের দেশে একটা বয়ান হাজির আছে। সেই বয়ানে ইসলাম অনুপস্থিত। আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করানো হয়েছে, ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে অপ্রাসঙ্গিক ছিল। এভাবেই তৈরি হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যের নির্মাণ।

জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমরা পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলাম। তারা ইসলামের নাম নিয়ে গণহত্যা জায়েজ করতে চেয়েছে। আবার সেই সময়ের কয়েকটি ইসলামপন্থী দল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান নেয়ার ফলশ্রুতিতে বাম ও সেক্যুলারপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধকে ইসলামের প্রশ্নে বুর্জোয়া ফায়সালা হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মুক্তিযুদ্ধের নির্মাণ ও পরিচালনায় ইসলাম ছিল প্রাধান্য বিস্তারকারী বয়ান। মুক্তিযুদ্ধকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ‘আল্লাহর পথে জেহাদ’ বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। মাঠের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা ছিলো ইসলাম; তারা শক্তি নিয়েছে ইসলামের ন্যারোটিভ থেকে। স্বাধীন বাংলা সরকারের বক্তব্য বিবৃতিতে ইসলাম খুব সাবলীলভাবে বর্তমান ছিল। আলেম সমাজের বড় একটা অংশ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন এবং দেশ বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠলো, সেটা কখনো খতিয়ে দেখা হয়নি। একটা জনগোষ্ঠি চলার পথের লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস, তাৎপর্যকে কীভাবে তার ‘পরিচয় বৈশিষ্ট্য’ হিসেবে সাথে নিয়ে চলে, সেটাও আমরা অনুধাবন করার চেষ্টা করিনি। ঠিক কীভাবে এই অঞ্চলের মানুষের মননে ও গঠন-তন্ত্রতে ‘ইসলাম’ এক বিশেষ অর্থ ও তাৎপর্যে স্থায়ী আসন নিয়ে নেয়; সেই তালাশ কেউ করেনি।

৭১’ এর বাংলাদেশ যে সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারতো, সেটা করতে না দিয়ে ইসলামের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের একটা কৃত্রিম বিরোধ লাগিয়ে রেখেছে সেক্যুলার মহল। ‘মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম’ সেই কৃত্রিম বিরোধের ধুলা কালি সরিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেক্যুলার বয়ানের কফিনে এই বই হয়ে উঠবে শেষ পেরেক।

প্রকাশক: গার্ডিয়ান পাবলিকেশন

মূল্য: 250 টাকা।

বইটা কিনতে হলে এখানে ক্লিক করুন।

 

Review by​: কমরেড মাহমুদ

১. বুক রিভিউঃ ‘‘মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম’’। 

বিশিষ্ট গবেষক Pinaki Bhattacharya সাহেবের লেখা ‘মার্কিন ডকুমেন্ট, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ৭১” বইটি পড়লাম। বইটি উনার লেখা বলতে উনার নিজেস্ব কোন কথা নেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমেরিকার ভূমিকা কি ছিল তার তথ্য প্রমাণগুলো এক যায়গায় করে তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি রেফারেন্স বুক বলতে পারেন।

গত রমজানের ঈদে পিনাকী সাহেব যখন থাইল্যান্ড এসেছিলেন তখন আমাকে তার হোটেলে ডিনারের দাওয়াত করেছিলেন। ঈদের দিন উনার হং দ্বীপ থেকে ফিরতে বেশি রাত হয়ে যাওয়ায় অবশেষে দেখা হয়নি। খুব ইচ্ছা ছিল সামনা সামনি দেখা হলে স্রোতে গা ভাসিয়ে না দেওয়া মানুষটার সাথে কিছু আলাপ জমাবো। সেই পিনাকী সাহেবের ব্যতিক্রম ইস্যুতে লেখা বইটি বের হলে বইটি না পড়ে থাকতে পারিনি। এজন্য www.boibajar.com কে ধন্যবাদ জানাই আমাকে বইটি পাঠানোর জন্য।

বইটি বাংলাদেশের চেতনাধারীদের জন্য বেশ একটি ধাক্কা দিবে বলে মনে করছি। ছোটকাল থেকে বাংলাদেশের মুক্তযুদ্ধ বিষয়ক যেসব ইতিহাস শিখেছি তার ভিতর মেক্সিমাম মনগড়া ইতিহাস। কোন তথ্য ছাড়া নিজের মত করে লিখেছেন একেকজন। ছোটকালে স্কুলে থাকতে জেনেছি আমেরিকা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সপ্তম বহর সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছিল। এর মাঝে দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ায় তারা ফিরে যায়। যদি একবার সেই বহর আমাদের জল সিমানায় ঢুকে পড়তো এই জীবনে স্বাধীনতা পাওয়া হইতোনা! এই ইতিহাসটি পড়তাম আর মনে মনে বলতাম, আল্লাহ্‌ বাচাইছে শালার ৭ম বহর আসার আগেই আমরা স্বাধীন হয়ে গেছিলাম! নাইলে উপায় কি হইতো!

এভাবে ভারত রাশিয়া ব্লকের বানানো অনেক মিথ্যা ইতিহাসকে এই বইটি তথ্য প্রমান দিয়ে তছনছ করে দিয়েছে। আম বাম মহোদয়গনেরা চল্লিশ বছরে যা যা প্রচার করেছে একটি বই দিয়ে পিনাকী সাহেব তাদের ডাইরেক্ট চল্লিশা করে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের বিক্রয় কেন্দ্রে বইটি রাখা অতীব জরুরী। কারন এমন তথ্যপূর্ণ নথি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক এমন একটি রেফারেন্স বুক খুবই দরকার আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য।

জানতে পারলাম বইটি নাকি কর্তৃপক্ষ মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের বিক্রয় কেন্দ্রে রেখেছিল, তারপর কারো ইশারায় বইটি সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছে! মিথ্যা ইতিহাস এই জাতি আর কতদিন খাইবো সেইটাই বুঝতেছিনা!

Review by​: আবদুল্লাহ মাহমুদ

২. বুক রিভিউঃ ‘‘মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম’’।
সংকলক: পিনাকী ভট্টাচার্য।
প্রকাশক:গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স।
মোট পৃষ্ঠা: ১৪৪।
মূল্য:২৫০.০০।

আল্লাহ্ তা’আলা মানুষ জাতিকে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সুশোভিত করেছেন যা অন্যদের মাঝে নেই; তা হল স্বাধীন ইচ্ছা শক্তি বা স্বাধীনতা। অন্যান্য মাখলুকাতের জন্য আল্লাহ্ নির্ধারণ করে দিয়েছেন নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা, যা তাদের জন্য দুর্লঙ্ঘনীয়।তাই মানুষ হচ্ছে স্বাধীনচেতা জাতি। তারা পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ থাকতে চায়না।

তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান পূর্বপাকিস্তান তথা বাংলাদেশের মানুষকে নানামুখী পন্থায় পরাধীনতার শিকলে বাধার নীলনকশা আঁকে।বাঙালি জাতি তাদের নীলনকশা আঁচ করতে পেরে দীর্ঘ নয় মাস জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করে পরাধীনতার শিকলকে ছিন্নভিন্ন করে বাংলা আকাশে স্বাধীনতার বর্ণিল সূর্য উদিত করে।

কোন জাতিকে বাধাগ্রস্ত করতে কিম্বা তাদের অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে অবনতির অতল গহ্বরে নিয়ে যাওয়ার অন্যতম এক জোড়ালে মাধ্যম হল তাদেরকে তথ্য সন্ত্রাসের জালে জড়িয়ে তাদের মাঝে বিদ্যমান মনোবলকে দমিয়ে রাখা।

ইসলামের ঊষালগ্ন থেকে ইসলামের গলাচিপে রাখাকল্পে একদল লোক ইসলামকে তথ্য সন্ত্রাসের শিকারি বানায়।উহুদ যুদ্ধে মুশরিক বাহিনী ‘নবী স: মারা গেছেন’ এই তথ্য সন্ত্রাসের মাধ্যমে মুসলিমদের মনোবলকে গুড়িয়ে দিয়ে মুসলিম বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে চেয়েছিল।অনুরূপভাবে ইংরেজদের বিপক্ষে যখন শাহ ইসমাঈল শহীদ ও সাইয়েদ আহমাদ ব্রেলভী যুদ্ধবাহিনী নিয়ে অবতরণ করেন, তখন ইংরেজরা উভয়ের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বিষিয়ে তোলার জন্য বিভিন্ন অপবাদ ও অপপ্রচার চালিয়ে তথ্য সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে ঘিরেও ইসলাম তথ্য সন্ত্রাসের শিকার। মিথ্যা পাটাতনের উপর বর্তমানে স্বাধীনতার ইতিহাস রচনা করা হয়েছে যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে সেক্যুলারিজমের উপর ভিত্তি করে,তৎকালীন আলেমসমাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষ।স্বাধীনতা ও ইসলামকে পরস্পর বিরোধিভাবে দাঁড় করিয়েছে যে, একটা থাকলে অন্যটা থাকবে না।

বিশিষ্ট কলামিস্ট পিনাকী ভট্রাচার্য এই মিথ্যা পাটাতনকে গুড়িয়ে দিয়ে স্বাধীনতা চাকচিক্যময় প্রকৃতি ইতিহাসকে তুলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন। বিভিন্ন উৎসের আলোকে প্রমাণ করেছেন ইসলাম ও স্বাধীনতা পরস্পর বিরোধী ছিলনা।বরং ইসলামের রঙে রঙিন হয়ে মুক্তিকামী যোদ্ধারা যুদ্ধ আঞ্জাম দিয়েছেন।স্বাধীনতার প্রতিটি পরতে পরতে ইসলামের স্পর্শ লেগে আছে।

পিনাকী ভট্রাচার্য গোটা বইটিকে ১৬ টি অনুচ্ছেদে ভাগ করেছেন।আমরা সেই অনুচ্ছেদের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী কিছুটা আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ

১ম অনুচ্ছেদ:আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী রাজনৈতিক দলিলে ইসলাম।

এর অধিনে পিনাকী প্রমাণ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্বে থাকা আওয়ামী লীগ যে তার জন্মলগ্ন থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল ছিল। ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করার পর তাদের সংবিধান কমিটি (ড. কামাল হোসেন যার চেয়ারম্যান ছিলেন) কর্তৃক প্রণীত খসড়া সংবিধানের প্রস্তাবনায় তদানীন্তন “পাকিস্তানের মুসলমানদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনকে কুরআন সুন্নাহর আলোকে গড়ে তোলার” কথা স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছিল।

২য় অনুচ্ছেদ: মুক্তিযুদ্ধ নির্মাণের বয়ান-বক্তৃতায় ইসলাম:

এর অধিনে পিনাকী বলেছেন,ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান “ইনশাআল্লাহ” শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন।

তাছাড়া ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি যে বেতার ভাষণ দিয়ে বিজয় ঘোষণা করেন সেখানে তিনি তাঁর বক্তৃতা শেষ করেন এই বলে, “আমি মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব দেশবাসীকে আল্লাহর প্রতি শোকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য ও একটি সুখী সমৃদ্ধশালী সমাজ গঠনে আল্লাহর সাহায্য ও নির্দেশ কামনা করার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।”

৩য় অনুচ্ছেদ:ইসলামি চিহ্ন ও পরিভাষা: স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিকামী মানুষের পাকিস্তান বিরোধী বহ্নিশিখা যেনো ধীমে না আসে এবং যেনো সর্বপ্রকারের লোক পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়া পড়ে, সে জন্য তাদেরকে উদ্দীপ্ত করতে স্বাধীন বেতার কেন্দ্র সবচে’ বড় ভূমিকা করে।

এ অনুচ্ছেদে পিনাকী বলেন,এই বেতার কেন্দ্র মানুষদের উদ্দীপ্ত করতে ইসলামের বজ্রবাণী প্রচার করত।শোনাত মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করলে রব তার জন্য কী মহান পুরস্কার রেখেছেন।

সে বেতারের প্রথম অধিবেশন শুরু করা হয় পবিত্র কুর’আন তেলাওয়াতের মাধ্যমে।কবি আব্দুস সালাম প্রথম অধিবেশনে মুক্তিযুদ্ধের যে প্রথম বেতার ঘোষণা দেন তা তিনি শুরু করেন, “নাহমাদুহু ওয়ানুসাল্লীয়ালা রাসুলিহীন কারিম” ও “আসসালামু আলাইকুম” দিয়ে।তারপর তিনি বলেন, “স্বাধীনতাহীন জীবনকে ইসলাম ধিক্কার দিয়েছে।…….যে জানমাল কোরবানি দিচ্ছি,কোরআনে করিমের ঘোষণা- তারা মৃত নহে,অমর।………আল্লাহর ফজল করমে……..বীর বাংলার বীর সন্তানেরা শৃগাল-কুকুরের মতো মরতে জানে না।মরলে শহীদ,বাঁচলে গাজী।…………

‘নাছরুম মিনাল্লাহে ওয়া ফাতহুন কারিব’।আল্লাহর সাহায্য ও জয় নিকটবর্তী”।

এছাড়া প্রত্যেকটি অধিবেশনে কুর’আন তেলাওয়াতসহ কুর’আন ও হাদীসের বাণী প্রচার করা হত,এবং ইসলামি বিধানের মাধ্যমে প্রমাণ করা হত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জালিমের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।অতএব ইসলামের বিধানানুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরজ।

৪র্থ অনুচ্ছেদ: মুক্তিযুদ্ধকালে সরকারি ঘোষণা ও নির্দেশনাবলিতে ইসলাম।

এখানে দেখানো হয়েছে, ১৪ এপ্রিল দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে অস্থায়ী সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনাবলি প্রচারিত হয়।তা শুরু করা হয় “আল্লাহু আকবর” ও শেষ করা হয় “আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নিকটবর্তী”বলে।তাতে আরও বলা হয় “বাঙালির অপরাধ আল্লাহর সৃষ্ট পৃথিবীতে,আল্লাহর নির্দেশ মতো সম্মানের সাথে শান্তিতে সুখে বাস করতে চেয়েছে।বাঙালির অপরাধ মহান স্রষ্টার নির্দেশমতো অন্যায়,অবিচার, শোষণ……..।……আমাদের সহায় পরম করুণাময় সর্বশক্তিমান আল্লাহর সাহায্য।……… মসজিদের মিনারে আজান প্রদানকারী মুয়াজ্জেন, মসজিদে-গৃহে নামাজরত মুসল্লি, দরগাহ-মাজারে আশ্রয়প্রার্থী হানাদারদের গুলি থেকে বাঁচেনি।…সর্বশক্তিমান আল্লাহতালার উপর বিশ্বাস রেখে ন্যায়ের সংগ্রামে অবিচল থাকুন।

৫ম অনুচ্ছেদ:মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতাকারীদের বুঝাতে ইসলামের প্রতিক ও চিহ্নের বিকৃত উপস্থাপন:

এর অধিনে লেখক প্রমাণ করেছেন: মুক্তিযুদ্ধের সময় ধৃত রাজাকার, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এদের যাদের ছবি এবং ভিডিও বিভিন্ন আর্কাইভে পাওয়া যায়, তাদের কারো মুখেই দাঁড়ি কিংবা মাথায় টুপি দেখা যায় না, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত এই দেশের প্রায় সকল নাটক-চলচ্চিত্রেই দেখা যায় রাজাকারদের মুখে দাঁড়ি আর মাথায় টুপির মত ইসলামী লেবাসে হাজির করা হয়।

৬ষ্ঠ অনুচ্ছেদ:রাজাকার ছিলো কারা?

এখানে লেখক রাজাকারদের সম্পর্কে অতি মূল্যবান তথ্য হাজির করেছেন এবং মানুষেরা রাজাকার বাহিনীতে কেনো যোগদান করতো, তার কারণ উল্লেখ করেছেন।

৭ম অনুচ্ছেদ:মুক্তিযুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতার উৎস খোঁজে: স্বাধীন বাংলাদেশেকে ভারতের স্বীকৃতির চিঠি।

পিনাকী ভট্রাচার্য এখানে যে মহান কামের আঞ্জাম দিয়েছেন, তা হলো যারা স্বাধীনতাকে ইসলাম বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে জনগণের হাতে তুলে দিয়েছেন, তাদের পাটাতন উপড়ে ফেলতে তিনি স্বাধীনতার ডকুমেন্টের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন এ “ধর্মনিরপেক্ষ” শব্দ স্বাধীনতার ইতিহাসে কখন জায়গা করে নিয়েছে।

৪৭ এর পর থেকে ২৩ নভেম্বর ১৯৭১ সাল পর্যন্ত স্বাধীনতার ইতিহাসের পাতায় “ধর্মনিরপেক্ষ” শব্দটির কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। বরং ৪৭ থেকে নিয়ে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত সকল সংগ্রামের চালিকাশক্তি ও প্রাণ ছিল ধর্মীয় অনুভূতি ও ধর্মীয় অনুশাসন।

২৪ এপ্রিল ১৯৭১ সালে প্রবাসী সরকার ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি চেয়ে চিঠি দেয়।কিন্তু ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও ভারত সরকারের কোনোরূপ সাড়া মেলেনি। তারপর ১৫ অক্টোবর আবার চিঠি দেয়া হয়। আবারও একমাস পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও কোনো সাড়া মেলেনি। এবার প্রবাসী সরকার অত্যন্ত বিচলিত হয়ে ২৩ নভেম্বর ৭১ সালে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে চিঠি দেয়।যাতে সর্বপ্রথম “ধর্মনিরপেক্ষ” শব্দটি উল্লেখ করা হয়।যা ছিল স্বাধীনতা ঘোষণার তিন নীতি বিরোধী।

৮ থেকে নিয়ে ১১ পর্যন্ত চারটি অনুচ্ছেদে তিনি মুক্তিযুদ্ধে আলেম ওলামাদের অবদান নিয়ে আলোকপাত করেছেন।

বামপন্থী ও সেক্যুলার লেখকেরা স্বাধীনতা যুদ্ধকে ইসলামের বিপক্ষে দাঁড় করানোর হীনমানসিকতাকে চরিতার্থ করার জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধে আলেম ওলামাদের অবদানকে বাক্সবন্দি করে রেখে প্রচারণা চালায় তাঁদের কোন অবদান নেই; বরং আলেমসমাজ মানেই স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি।

অথচ স্বাধীনতা যুদ্ধে আলেমসমাজের স্বাধীনতার পক্ষে কর্মতৎপরতা ছিলো ব্যাপক।পিনাকী ভট্রাচার্য সেসব বাক্সবন্দি আলেমসমাজের অবদানকে বের করে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। তিনি বর্ণনা দিয়েছেন সে সময়ে বাংলাদেশের শীর্ষ আলেম হাফেজ্জি হুজুর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান গ্রহণের এবং পাকিস্তানিদের জালেম এবং মুক্তিযুদ্ধকে ‘জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই’ বলে অভিহিত করার দীপ্ত বক্তব্যকে।” মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম’ এর পূর্ব পাকিস্তানের আমির ছিলেন মরহুম শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এই বিষয়টিও এই বই থেকেই জানা যায়। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা আরো অনেক আলেমদের ইতিহাস তিনি এ বইয়ের উপস্থিত করেছেন।

বাংলাদেশের আলেম ওলামাদের পাশাপাশি উপমহাদেশের আলেম ওলামাগণও মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দিয়েছিলেন, যা এই বইতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল ও ভারতীয় পার্লামেন্টের লোকসভার সদস্য হজরত আসআদ মাদানী (র.), পশ্চিম পাকিস্তানের আলেম জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের সেক্রেটারি মুফতি মাহমুদ, শায়খুল ইসলাম হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী (র.) এবং মাওলানা কাওসার নিয়াজী অন্যতম।

সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম ডাকটিই দিয়েছিলেন ‘রেড মওলানা’ হিসেবে বিশ্বখ্যাত মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী।

১২ তম অনুচ্ছেদ: রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের চিঠিপত্রে ইসলামি ভাব-প্রভাব:

এ অনুচ্ছেদের অধিনে পিনাকী ভট্রাচার্য মুক্তিযোদ্ধাদের সেসব চিঠি উল্লেখ করেছেন যা তাঁরা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাঁদের পরিবারকে দিয়েছিলেন। এসব চিঠি ইসলামি আলাপচারিতায় ভরপুর।তাঁরা তাঁদের পরিবারকে এ বলে সান্ত্বনা দিতেন যে,আমরা শহীদ হতে যাচ্ছি। তাই আমাদের রক্ত বৃথা যাবে না।এমনকি তাঁরা তাঁদের পরিবারের কাছে দু’আ চাইতেন শহীদী মৃত্যুর জন্য।কারণ, তাঁরা জানতেন ধর্মীয় লাভ না থাকলে তাদের পরিবার তাঁদের মরণকে সহজে মেনে নিবে না।তাছাড়া মুক্তিবাহিনী যখন উপলব্ধি করেছিলেন দেশের জন্যে মারা গেলে শহীদী মর্যাদা পাওয়া যাবে, তখন তাঁরা জান্নাতের আশায় শরীরের রক্ত ঝরাতে কার্পণ্য বোধ করেননি।

১৩তম অনুচ্ছেদ: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত অনুষ্ঠানসমূহে ইসলাম প্রসঙ্গ:

আমরা ইতিপূর্বে ৩য় অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে কিছু কথা বলেছি।এখানে পিনাকী ভট্রাচার্য স্বাধীন বেতার কেন্দ্রের কিছু অনুষ্ঠানের বর্ণনা দিয়েছেন। যে অনুষ্ঠানসমূহে নানাভাবে ইসলামি বয়ান ও ভাবনা দিয়ে সবাইকে উদ্দীপ্ত করা হতো। যেমন,অনুষ্ঠানের নাম ছিল,”আল্লাহর পথে জেহাদ”, “ইসলামের দৃষ্টিতে জেহাদ”, “রমজানের ঈদের স্মৃতি-আলেখ্য” ইত্যাদি।

১৪তম অনুচ্ছেদ: মুক্তিযুদ্ধকালীম আওয়ামী লীগের মুখপত্র ‘জয়বাংলা’ পত্রিকায় ইসলাম প্রসঙ্গ।

মুক্তিযুদ্ধ সময়ে প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে “জয়বাংলা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হত।এ পত্রিকায় প্রকাশিত হত মুসলিম দেশগুলোর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া। লেখক পিনাকী তা এই অনুচ্ছেদে তুলে ধরেছেন।

১৫তম অনুচ্ছেদ হচ্ছে ‘উপসংহার’:

লেখক এখানে একটি চমৎকার কথা বলেছেন।তা হল ‘এই ঘটনা (যুদ্ধ) শুধু বাঙালির ইতিহাসের জন্য নয়,মুসলমান বা ইসলামের ইতিহাসের জন্যও এক গুরুত্বপূর্ণ লড়াই।কারণ বাংলাদেশের মানুষ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর নিজেদের অধিকার কায়েম করতে গিয়ে ইসলাম ত্যাগ করেননি, ইসলামের সভ্যতা ও সংস্কৃতির ওপর তাদের হক তারা বিসর্জন দেননি।’

১৬তম অনুচ্ছেদ; এখানে গৌতম দাস কর্তৃক লিখিত ‘মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম= প্রসঙ্গ’ শীর্ষক এক পরিশিষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে।এই প্রবন্ধটি যেন সোনায় সোহাগা। যাতে কিছু বিষয়ে অমূল্য কিছু তথ্য প্রদান করা হয়েছে।এবং কিছু বিষয়ে যে মিথ্যার মেঘ জমে আছে,তা তিনি অপসরণ করেছেন।

মোদ্দা কথা, স্বাধীনতা কেন্দ্রিক ইসলাম বিরোধী যাবতীয় মিথ্যা তথ্যের অবগুণ্ঠন উন্মোচন করা হয়েছে এই অমূল্য গ্রন্থে।যেই সত্য ইতিহাস বামপন্থী ও সেক্যুলারপন্থীদের গ্রন্থে ঠাঁই করে না নিতে পারায় ডুকরে কাঁদছিল, সেই ইতিহাস পিনাকী ভট্রাচার্যর এ গ্রন্থে সসম্মানে ঠাঁই করে নিয়েছে।যেনো ইতিহাস জগতে উন্মোচিত হয়েছে এক নব দিগন্ত।

Review by​: মুহাম্মদ সজল

৩. বুক রিভিউঃ ‘‘মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম’’।
লেখকঃ পিনাকী ভট্টাচার্য
প্রকাশনাঃ গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স

মুক্তিযুদ্ধ বাস্তবিক অর্থে সম্পদ ও ক্ষমতার অসম বন্টন সংক্রান্ত ক্ষোভ থেকে সংঘটিত হয়েছিল।এই কারন এত শক্তিশালী ছিল যে আর কোন কারনকে উল্লেখ না করেই শুধুমাত্র এটাকেই যদি মুক্তিযুদ্ধের কারন বলে উল্লেখ করা হয়,সেটা অত্যুক্তি হবে না।

বিভিন্ন ভাষা ও নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী নিয়ে যখন একটা পলিটি গঠিত হয়, তখন তার দায় হয়ে ওঠে অন্তর্গত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে নিজের মধ্যে ধারন করে একটা সাধারন পরিচয়ের ভেতরে নিয়ে আসা, একটা নতুন জাতি গঠন করা। কিন্তু জাতিরাষ্ট্রের এক বড় সংকট, সে শেষমেশ গিয়ে এক জাতির শাসনের যন্ত্রে পরিণত হয়, পাকিস্তানেও তাই হয়েছিল।

পাকিস্তান রাষ্ট্রে সম্পদ ও ক্ষমতার মালিকানা কুক্ষিগত হয়েছিল পাঞ্জাবিদের হাতে, ব্যাপকভাবে বঞ্চিত ছিল বাঙালি,পাঠান ও বেলুচরা।এই শোষনে পাঞ্জাবিদের একার দায় ছিল না,বাঙালিরাও তাদের যথেষ্ট সুযোগ করে দিয়েছিল, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও আবুল মনসুর আহমদের লেখায় বারবার এসেছে, বাঘা বাঘা নেতা থাকার পরেও কিভাবে বাঙালি নেতারা নিজেদের ভেতর কোন্দল করে বারবার পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা গ্রহনের সুযোগ হাতছাড়া করেছেন।

কিন্তু বাংলা পাকিস্তান হবার আগেই একটা নিজস্ব পলিটিক্যাল ডাইনামিক্স দাড় করিয়ে নিয়েছিল,যা পাকিস্তান হবার পরেও মোর অর লেস একই ছিল, তাই বাংলা পাঞ্জাবিদের বিরুদ্ধে সহজে একটা রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়, যা পাকিস্তানের অন্যান্য বঞ্চিত প্রদেশগুলো পারে নি। এই প্রতিরোধে যে তৎকালীন আঞ্চলিক শক্তি ভারতের প্রভাব ছিল না,তা বলা কঠিন, কিন্তু আন্দোলনের নাটাই বাঙালিদের হাতেই আগাগোড়া ছিল একথা স্পষ্ট। যেই বাঙালি মুসলমান পাকিস্তান কায়েমের জন্য সমগ্র ভারতের মধ্যে সবচাইতে বেশি লড়াই করেছে,সেই বাঙালি মুসলমানই আবার পাকিস্তান ভাঙার জন্য সবার আগে সচেতনভাবে উঠে দাড়িয়েছে।

বাঙালি নেতাদের ক্ষমতার হিস্যা বুঝে নেয়ার লড়াইয়ের ফলাফল গিয়ে দাঁড়ায় ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়, কিন্তু এই বিজয় আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসাতে যথেষ্ট ছিল না।

কিন্তু, এই বিজয় দেশে একটা স্বাধীনতা আন্দোলনের ডাক দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল। একটা ছাইচাপা আগুন একাত্তরের মার্চে বিরাজ করছিল বাংলার মানুষের ভেতর।

এই আগুন নিভিয়ে দিতেই অপারেশন সার্চলাইট চালানো হয়, কিন্তু ফলাফল দাঁড়ায় ঠিক বিপরীত।

ভয়াবহ এই গণহত্যার পর রুখে দাঁড়ায় এই জনপদের মানুষ, শুরু হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ।

“মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম” বইটিতে লেখক পিনাকী ভট্টাচার্য দেখিয়েছেন, কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিল।

মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শুরু থেকেই বাংলাদেশের সাধারন মানুষের বিরুদ্ধে হওয়া এই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী যুদ্ধকে পাকিস্তান সরকার “ইসলাম রক্ষার যুদ্ধ” হিসেবে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করেছে।কিন্তু ইসলাম রক্ষার যুদ্ধে যখন এমন এক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেই গণহত্যা চালানো হয়, যারা নিজেরাই মুসলিম পরিচয় এবং ইসলামকে হৃদয়ের গভীরে ধারন করে, তখন এই যুদ্ধকে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ন্যায়সঙ্গত বলা যায় না,কিন্তু স্বার্থরক্ষার্থে পাকিস্তান রাষ্ট্রের এছাড়া উপায় ছিল না।

অর্থ ও ক্ষমতার অসম বন্টন থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধকে ইসলাম দিয়ে জাস্টিফিকেশন শুধু পাকিস্তান সরকারই করে নি, বরং বাঙালিরা,বিশেষভাবে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত জোরালোভাবেই ইসলামের ভেতরেই খুজেছেন পাকিস্তানকে কিভাবে মোকাবেলা করা হবে তার জাস্টিফিকেশন।

এই বইয়ে পিনাকী ভট্টাচার্য দেখিয়েছেন কিভাবে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো ও স্বাধীনতার ঘোষণায় ইসলাম উপস্থিত ছিল।

তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, দাড়ি-টুপি পাঞ্জাবি মানে রাজাকার বলে যে মিথ মিডিয়া আমাদের সামনে নিয়ে আসে,তা কত ঠুণকো ও অসার। এই বইয়ে বেশ শক্তিশালী হয়ে উপস্থিত হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের একটি বড় অংশের সরাসরি অংশগ্রহন, সেই সাথে পাকিস্তানী আলেমদের একটি অংশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভুতি।

এই বইতে দেখানো হয়েছে, আমাদের গেরিলা যোদ্ধাদের মিলিটারি ম্যানুয়াল থেকে শুরু করে স্ত্রীর কাছে লেখা একান্ত ব্যক্তিগত চিঠিতে কিভাবে উপস্থিত ছিল ইসলামী আদব ও ভাবধারা,মুক্তিযোদ্ধারা কেউই এখানে ইসলামকে এড়িয়ে যান নি, বরঞ্চ ইসলামের আদর্শেই তারা খুজেছেন লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা।

এই বই মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত প্রচলিত বয়ানের মূলে কুঠারাঘাত হানে, এই বই স্পষ্ট করে দেয়, মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি কোনদিনই ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল না, বরং সেখানে ছিল সাম্য, ইনসাফ ও মানবিক মর্যাদা। সম্ভবত মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে ভারত সরকারের স্বীকৃতি পাওয়ার জন্যই মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে আসতে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার বাধ্য হয়।

এই বই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধচর্চার ইতিহাসে একটি বড় পরিবর্তনের জন্ম দিতে যাচ্ছে। অসাধারন তথ্যবহুল বইটি রেফারেন্সের বর্মে ঢাকা, চাইলেই এর কোন একটা বক্তব্যকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়া সম্ভব নয়।

মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম বইটি সুস্পষ্টভাবে সাক্ষ্য দিচ্ছে, একাত্তরের পরে বাঙালি ও মুসলিম পরিচয়ের মধ্যে তৈরি হওয়া বিভেদ সেক্যুলারদের তৈরি করা এক কাল্পনিক বিভেদ।এর কোন বাস্তব ভিত্তি নাই।

মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিও ইসলাম নয়, পাকিস্তান রাষ্ট্রকে আমরা বিদায় জানিয়েছি, ইসলামকে নয়।

Review by​: মুনির আহমেদ

৪. বুক রিভিউঃ ‘‘মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম’’।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের দেশে যে বয়ান হাজির আছে সেখানে ইসলাম অনুপস্থিত। আমাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করানো হয়েছে, `ইসলাম’ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতে অপ্রাসঙ্গিক ছিল। এভাবেই তৈরি হয়েছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য আর হেরিটেজের নির্মাণ।

ঐতিহ্য বা হেরিটেজ আসলে ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত এক একটি ডিসকোর্স বা বয়ান। অর্থাৎ- ইতিহাসের হাত ধরে গড়ে ওঠে এমন একটা চলতি বয়ানই হচ্ছে ঐতিহ্য বা হেরিটেজ। এই ঐতিহ্যকে আমরা কোন সচেতনতা ছাড়াই বহন করি- তার উৎস বা কার্যকারণ না জেনেই। রোলা বার্তে তার মিথোলজিস বইয়ে বলেছেন, “আমরা যেই বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করি, তার জমিনটা তৈরি করে দেয় ইতিহাসের কোন বয়ানের মধ্যে আমরা বাস করি সেইটা”।

মুক্তিযুদ্ধে আমাদের লড়াই হয়েছিল পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে- জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার অর্জনের জন্য। পাকিস্তানি শাসকেরা ইসলামের নাম নিয়ে তাঁদের গণহত্যা জায়েয করতে চেয়েছে। আবার সেইসময়ের কয়েকটা ইসলামপন্থী দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অবস্থান নেয়ার কারণে এই দেশের বাম ও স্যেকুলারপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধকে ইসলামের প্রশ্নে বুর্জোয়া ফয়সালা হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছে। কিন্তু আসলে মুক্তিযুদ্ধের নির্মাণে, মুক্তিযুদ্ধের পরিচালনায় ইসলাম ছিলো প্রাধান্য বিস্তারকারী বয়ান। মুক্তিযুদ্ধকে স্বাধীন বাঙলা বেতার ‘আল্লাহর পথে জিহাদ’ বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। মাঠের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা ছিল ইসলাম। তারা শক্তি নিয়েছে ইসলামের ন্যারেটিভ থেকে।

স্বাধীন বাঙলা সরকারের বক্তব্য বিবৃতিতে ইসলাম ডমিন্যান্টভাবে বিদ্যমান ছিলো। দেওবন্দী ধারার আলেমরা দেশে এবং বিদেশে এমনকি খোদ পাকিস্তানে বসে কেউ মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহমর্মিতা, আর কেউ আন্তর্জাতিক সংহতি সৃষ্টিতে ভূমিকা নিয়েছেন। দেশের আলেমদের অনেকেই সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। তাঁরা সবাই এই লড়াইকে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই বলেই অভিহিত করেছেন।

পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনকে আমাদের স্যেকুলার বয়ানে দেখানো হয়েছে একটি প্রতিক্রিয়াশীল ঘটনা হিসেবে। অথচ পাকিস্তান সৃষ্টি এই অঞ্চলের অন্যতম প্রগতিশীল উল্লম্ফন। সেই পাকিস্তান তার জন্মের দায় শোধ করতে না পারার কারণেই তো বাংলাদেশের সৃষ্টি। কিন্তু পাকিস্তান আন্দোলনের মধ্যে থেকে ‘ইসলাম’ নিজ পরিচয়ের সঙ্গে লেপ্টে কীভাবে এই জনগোষ্ঠির আরেক অন্যতম পরিচয় বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠলো, সেটা কখনো খতিয়ে দেখা হয়নি। একটা জনগোষ্ঠি, চলার পথে লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস, তাৎপর্যকে কীভাবে তার ‘পরিচয় বৈশিষ্ট্য’ হিসাবে সাথে লেপ্টে নিয়ে চলে, সেটাও আমরা অনুধাবন করার চেষ্টা করিনি। ঠিক কীভাবে এই অঞ্চলের মানুষের মননে ও গঠন-তন্তুতে ‘ইসলাম’ এক বিশেষ অর্থে আর তাৎপর্যে স্থায়ী আসন নিয়ে নেয়; সেই তালাশ কেউ করেনি। কারণ তাহলেই আমাদের প্রগতিশীল মহল হৈ হৈ রৈ রৈ করে উঠবে। সেকারণেই মুক্তিযুদ্ধকে সেই জমিদারি উচ্ছেদের লড়াইয়ের পরিণতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখার কোন সচেতন চেষ্টাও হয়নি।

৭১ এর বাংলাদেশ যে সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারতো, সেটা করতে না দিয়ে ইসলামের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের একটা কৃত্রিম বিরোধ লাগিয়ে রেখেছে এই স্যেকুলারেরা। এই বই সেই কৃত্রিম বিরোধের ধুলা-কালি সরিয়ে মুক্তিযুদ্ধের এক নতুন বয়ান উপহার দেবে।

Subscribe to
Newsletter